ট্রেক ৪৫০০

আমার ৬৪ জেলা ভ্রমণে ঝালকাঠিতে ‘কেওক্রাডং বাংলাদেশ’ গ্রুপের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল। এর আগে মুনতাসীর ভাইয়ের নাম শুনলে তাঁর সাথে কখনও দেখা হয় নাই। এই পথেই প্রথম তাঁর সাথে দেখা হয়। কেন ফর্ডের সাথেও ওখানেই প্রথম পরিচয়। উনাদের গ্রুপটায় অনেকেই ছিলেন এর মধ্যে কেন ফোর্ড আর মুনতাসীর ভাইয়ের সাইকেলটা ছিল আলাদা। অন্যসব সাইকেল পরিচিত হলেও উনাদের দুইজনের সাইকেল প্রথম দেখাতেই আলাদা লেগেছিল। এর মধ্যে কেন ফোর্ডের কি সাইকেল ছিল তা মনে নাই। তবে মুনতাসীর ভাইয়ের ট্রেক ৩৫০০ ছিল। উনার সাইকেলটা দেখে তখনই মাথার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল যদি কখনো একটু দামি সাইকেল কেনার সুযোগ হয় তো ট্রেকই কিনবো।

পরবর্তীতে যখন অনুসন্ধান করলাম তখন দেখা গেল বাংলাদেশে এই টাইপের সাইকেল কেনার কোন অপশনই নাই। খুব ভাল সাইকেল কিনতে হলে দুইটা অপশন ছিল। একটা হইল চট্টগ্রামের বাইককম। আরেকটা হইল বিদেশ থেকে যাঁরা এই দেশে কাজ করতে আসেন তাঁরা অনেকেই সাইকেল নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে ফেরার সময় এই সাইকেলগুলা বিক্রি করে দিয়ে যান। এর জন্য গুলশানের দিকে নিয়মিত খোঁজ খরব রাখতে হয়।

তারপর আবার দামের বিষয়টা যখন দেখলাম তখন দেখা গেল, এই সাইকেল কেনা আমার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না। কিন্তু মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে তখন তো বড় স্বপ্নই দেখে। তাই ইচ্ছাটা কোনদিন যায় নাই। ভেবেছিলাম নিশ্চয়ই কোন একদিন এই সাইকেল কেনার সামর্থ্য হবে।

এর পরের ইতিহাস সবারই জানা। বিডি সাইক্লিস্টের ফলে বাংলাদেশে সাইকেলের একটা বাজার তৈরি হয়ে গেছে। এখন টাকা হলেই অনেক ব্র্যান্ডের সাইকেল দেশেই কেনা যায় এবং ঐ ব্র্যান্ড না থাকলেও বাইরে থেকে আনানোর অনেক সহজ রাস্তা বের হয়ে গেছে। কিন্তু সেই টাকার সামর্থ্য এখনো আমার এখনো হয় নাই। বিডিসির ১০০ মাইল জোসিলা রাইডে পরিচয় হয়েছিল সতিশের সাথে। সতিশ তখন জায়ান্ট সাইকেল চালায়। সেই সাইকেল দেখার পরে জায়ান্ট কেনারও আগ্রহ হয়েছিল। কিন্তু প্রথম পছন্দের তালিকায় সব সময়ই ট্রেক ছিল।

অনেক হিশাব-নিকাশ করে দেখা গেল আমি প্রতি মাসে ২ হাজার টাকার মতো সেভ করতে পারি। কিন্তু দেখা যায় দুইতিন মাস টাকা জমানোর পরেই হয়তো একটা ট্যুরে গিয়ে সেই টাকা শেষ হয়ে যায়। এর মধ্যে রাব্বি ভাই, ফয়সাল ভাই পরিচিত যাঁরা ছিলেন সবাই ট্রেকসহ নানা রকম ব্র্যান্ডের সাইকেল কিনে ফেলেছেন। অথচ আমার কোন নামি-দামি ব্র্যান্ডের সাইকেল নাই। কিন্তু ভ্রমণে যত মানুষ আছে পরিচিত বেশির ভাগ মানুষই আমাকে সাইকেল শরীফ নামেই চেনে।

এর মধ্যে রাব্বি ভাই-ই একদিন সম্ভবত ফয়সাল ভাইকে বলতেছিলেন, ‘শরীফ এতদিন ধরে সাইকেল চালায় ওকে একটা ভাল সাইকেল কিনে দেয়া দরকার।’ তখন সত্যি সত্যি একটা আশার আলো দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা আর বেশিদূর আগায় নাই।

কিছু সময়ের মধ্যে সাইকেল নিয়ে মাতামাতিও কমে গিয়েছে। রাব্বি ভাইয়ের ট্রেক ধুলা পড়তে পড়তে শেষ। ফয়সাল ভাইয়ের সাইকেল বারান্দায় পড়ে থাকতে থাকতে রোদে বৃষ্টিতে সাস্পেনশনের ১২ টা বেজে গেছে। কিন্তু আমার স্বপ্ন আর পূরণ হয় না। টাকাও জমাইতে পারি না।

একদিন ফেসবুকে দেখি পিণাক পানি ভাইয়ের এডোরি রোড বাইক বিক্রির বিজ্ঞাপন। তিনি ভারতে চলে যাবেন পড়াশুনার জন্য তাই বিক্রি করে দিতে চাচ্ছেন। কি মনে করে সেখানে একটা কমেন্ট করেছিলাম, ‘আমার টাকা থাকলে নিয়ে নিতাম।’ রোড বাইকের প্রতি আমার একটা দুর্বলতা আছে। ততদিনে আমার পুরানো ৬৪ জেলায় ঘুরে আসা রোড বাইকটার ফ্রেম ভেঙ্গে গিয়েছিল সুন্দরবনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি পিণাক ভাইয়ের ফোন, ‘ভাই আপনে যেদিন ফ্রি সেদিন এসে সাইকেলটা নিয়ে যান।’ অবিশ্বাস্য একটা প্রস্তাব। তিনি ভারতে যাওয়ার আগে এই অসাধারণ সাইকেলটা আমাকে উপহার স্বরূপ দিয়ে গেলেন। এই সাইকেল যদি সেকেন্ড হ্যান্ডও কিনতে চাইতাম তবুও আমার অন্তত ১০ মাস টাকা জমাইতে হইত।

বাজারে একটা কথা চালু আছে ফুয়াদ ভাইয়ের অনেকগুলা সাইকেল আছে। ফেসবুকের কোন এক পোস্টের কমেন্টের মাধ্যমে ফুয়াদ ভাইয়ের সাথে কথা হইতেছিল। বললাম ভাই, ‘আপনার তো অনেকগুলা সাইকেল আছে একদিন এসে একটা নিয়ে যাব।’ ফুয়াদ ভাইও দেখি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ভাইরে এখন আর বেশি সাইকেল নাই। ভাইব্রাদাররা নিয়া গেছে। তুমি যে কোন সময় আইস। পছন্দ হইলে নিবা।’ এই রকম ঈর্ষণীয় ভালোবাসা সম্ভবত খুব কম মানুষই পৃথিবীতে পায়।

কথায় আছে যখন ভাল সময় আসে তখন বারবার আসতে থাকে। আরেকদিন ফেসবুকে দেখি একজন ট্রেক ৪৫০০ বিক্রি করবেন অর্ধেকেরও কম দামে। কি মনে করে উনাকে ফোন দিলাম। একদিন গিয়ে দেখেও আসলাম একদমই চকচক করতেছে। সেই ভাইয়ের অনেকটা রাব্বি ভাইয়ের স্বভাব, হুজুগে সাইকেল কিনছে, কিনে ফেলে রাখছিল। সবই নতুনের মতো। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলাম ভাই কাগজপত্র আছে তো? দেখা গেল কাগজপত্রও আছে।

সবকিছুই একসঙ্গে মিলে গেল। কিন্তু টাকা নাই। হিশাব করে দেখলাম এই টাকা যোগাড় করতে আমার এক বছরেরও বেশি সময় লাগবে। কি মনে করে বাহার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। বললাম, ‘ভাই অনেকগুলা টাকা ধার লাগবে, কবে দিতে পারবো জানি না।’ সাইকেলের কথা শুনে তিনি দুয়েকদিনের মধ্যেই ব্যাংকে টাকা ট্রান্সফার করে দিলেন। টাকা তো পেলাম কিন্তু শোধ তো করতে হবে।

মনে পড়লো রাব্বি ভাইয়ের কথা। ছোট্ট একটা তালিকা তৈরি করলাম। রাব্বি ভাই, ফয়সাল ভাই, পিংকি আপু, লিপু ভাই, মোহাম্মদ ভাইসহ আরো দুয়েকজন। এই মানুষগুলার কাছে মুক্ত হস্তে টাকা চাইতে পারি। অন্তত তাঁরা আমার সাইকেল প্রীতির কথা জানেন। হিশাব করেছিলাম এঁদের কাছ থেকে অর্ধেক টাকা আসবে পুরানো সাইকেল আর নিজের কিছু টাকা মিলে অর্ধেক, এভাবেই পুরা টাকাটা হয়ে যাবে।

শেষ পর্যন্ত সেই তালিকার একজন ছাড়া মোটামুটি সবাই সহযোগিতা করতে পেরেছিলেন। একজনের সমস্যার কারণে দিতে পারেন নাই। ফেসবুকে পুরানো সাইকেল বিক্রি এবং নতুন সাইকেল কেনার বাসনার কথা শুনে নিজেই আরেকজন টাকা দিয়েছিলেন, সেটা হইল রাতুল ভাই। সবার কাছ থেকে যে টাকা পেয়েছিলাম তা দেখা গেল অনেক বেশি। সাইকেল কেনার তিন ভাগের দুই ভাগ টাকা চলে আসছিল এঁদের কাছ থেকেই।

এভাবেই আমার ট্রেক ৪৫০০ সাইকেলটা কিনতে পেরেছিলাম। এইসব মানুষের সহযোগীতা আর ভালবাসা না পেলে কোনদিনই হয়তো ট্রেক কেনার সুযোগ হতো না। অন্তত নিজের টাকায় একটা ট্রেক ৪৫০০ কেনার সামর্থ কবে হবে সেটা এখনো নিজের কাছেই প্রশ্ন আছে।

আরেকটা বিষয় হইল দাম দিয়ে সাইকেল পেলেও সাইক্লিং নিয়ে সম্ভবত আমার বেস্ট কাজটা কম দামী সাইকেল দিয়েই করে ফেলেছি।

১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.