দি ন্যারেটিভ অব আর্থার গর্ডন পিম—সুরাইয়া বেগম

খুব ছোট বেলা বলা যাবে না। মনে হয় অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে পড়ি। তখন প্রথম এনাকোন্ডা মুভিটি দেখি। তখন আমাদের বাড়িতে সিডিতে সবাই মুভি দেখত। যদি কোন ইংরেজি মুভি আমরা দেখতে চাইতাম তবে সে ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হত। যাতে করে বাড়ির বড় কেউ না থাকে বা কাজে ব্যস্ত থাকে শুধু মাত্র তখনই আমরা ঐ মুভি দেখতাম। তবে ঐ মুভিগুলো সব বাংলায় ডাবিং করা থাকলেই শুধুমাত্র আমরা দেখতাম। তো যা বলছিলাম, একদিন আমার ইমিডিয়েট বড় ভাইসহ তাদের সমান ভাইরা মিলে এনাকোন্ডা মুভিটি আনে। ঐ মুভিটিও বাংলায় ডাবিং করা ছিল। ঐ মুভি দেখে আমি ভয়ে পানিতে নামতে পারিনি প্রায় এক থেকে দেড় মাসের মত। পানিতে নামলেই মনে হত এই বুঝি কোন সাপ এসে আমাকে পেচিয়ে পানির নিচে নিয়ে যাবে! এনাকোন্ডা মুভি দেখে যে মানুষ পুকুরে নামতে পারছে না সে কি করে নদী বা সমুদ্রে যাবে। নদী বা সমুদ্রে না যেতে পারলেও বই পড়ে ঠিক যাওয়া তো যায়ই।

যে প্রসঙ্গে এই কথাগুলো আসলো তা হল সমুদ্রে দূর্দান্ত অভিযানের একটা অনুবাদ গ্রন্থ। গল্পের প্রধান চরিত্র হল আর্থার গর্ডন পিম। আর্থার সমুদ্রে যেতে খুব ভালবাসত। কিন্তু তার পরিবার এটা পছন্দ করত না। তাই একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে বন্ধুর সাথে জাহাজে উঠে বসলেন। বন্ধু অগাস্টাস আর্থারকে লুকিয়ে রেখেছে জাহাজের এমন এক জায়গায় যেখানে সহজে কেউ যায় না। সেই লুকিয়ে রাখার মধ্যেও ছিল একটা অ্যাডভেঞ্চার। কারণ সেই লুকানো জায়গাটা ছিল খুব অন্ধকার আর তেলের ড্রামে ভরা। আর্থার সেখানে দিন রাতের হিসেব মেলাতে পারেনি। প্রথম কয়েকদিন বেশ ভাল কাটল কিন্তু তারপর বন্ধু অগাস্টাসের দেওয়া নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। লুকানো জায়গা থেকে কোন ভাবেই বের হতে পারছিলনা আর্থার। কত দিন কেটে গেছে বলতে পারছিলনা আর্থার। মৃত্যুর প্রায় দোর গোড়া থেকে ফিরে আসে আর্থার। মৃত্যুর প্রথম ধাক্কা সামলাতে যে পথ তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে তা মনে হয়েছে আমার কাছে মৃত্যুর থেকেও বেশি যন্ত্রণাকর। বইটি পড়ার সময় নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়েছে। বুঝতেই পারছিলাম না এটা আমার সাথে ঘটছে না। এটা আর্থারের সাথে ঘটছে।

জীবন মানুষকে এমন একটা দিকে নিয়ে যায় যেখানে ইচ্ছে করলেই মানুষ নিজে নিজের ভাগ্য লিখে নিতে পারে না। মানুষ তখন সৃষ্টিকর্তার উপরই ভরসা রাখে। আর্থারের জার্নি শুরু। একসময় বন্ধু অগাস্টাস এসে উদ্ধার করে আর্থারকে। কেন তাকে উদ্ধার করতে আগে যাওয়া হয়নি তা গোপনে সব বিবরণ দিল অগাস্টাস। জাহাজে ঘটে যায় অনেক ঘটনা। এই সব নিয়ে চলতে থাকে জাহাজ আর আর্থারের জার্নি। এক সময় জাহাজে আবার শুরু হয় মার মার কাট কাট ব্যাপার। সেখানে মার মার কাট কাট ব্যাপারে পুরে জাহাজ ধ্বংশ হয়ে যায়। বেঁচে যায় অল্প কয়জন। খাবার নেই, পানি নেই আর জাহাজের এক পাশ কাত হয়ে গেছে তাই চারপাশে হাঙ্গরের আনাগোনা। এই সব অসহনীয় পরিস্থিতি নিয়ে এগুচ্ছে সমুদ্রের জার্নি।

আমার একটা জিনিস জানা ছিল না যে সমুদ্রে এক সময় মানুষের রক্ত দিয়ে পানির পিপাসা মিটায় আর মাংস খায়। লোমহর্সক কাহিনী। আমি এইটুকু পড়ে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছি। এই অবস্থায় একসময় বড় একটি বাণিজ্যিক জাহাজ আর্থার এবং তার এক সহকর্মীকে উদ্ধার করে। আর তার প্রিয় বন্ধু অগাস্টাস সমুদ্রে সার্ভাইভ করতে পারেনি। সে মারা যায়। উদ্ধারকারী জাহাজের সকলের জীবন একসাথে নাস হয় এক মুকুসধারী উপজাতির হাতে। কেমন নরপিশাচ হতে পারে মানুষ তার একটা দিক পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত আর্থারের জীবনে শুধু বিপদ আর বিপদ।

বইটি পড়ার পর আমার মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের ক্ষেত্রে যে কথাটা বলা হয় ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ এমনটা। আমি শেষ খুঁজতে খুঁজতে অনেকটা সময় পার করেছি ইন্টারনেটে। এটার অন্য কোন পার্ট আছে কিনা। আসলে বইটা এমন বিমোহিত করেছিল যে আর্থারকে খুঁজেছি সব জায়গায়। আর্থারকে খুব হিংসে হয়েছে। সে এত মানুষিক ক্ষমতা পেয়েছে কোথা থেকে? আর্থারের আচরণের এই জিনিসটা আমার অনেক ভাল লাগে, ‘সুযোগ বার বার আসে না আর যখনই আসে তখনই তা লুফে নিতে হয়।’

এই বইয়ের লেখক সম্পর্কে মোটামুটি যারা অ্যাডভেঞ্চার বই পড়ে এবং অ্যাডভেঞ্চার জগতের সাথে যুক্ত তারা সকলেই কম বেশি জানেন। লেখক যতগুলো রোমাঞ্চকর কাহিনী লেখে গেছেন তার সবগুলোই মানুষের মনে দাগ কেটে গেছে। আর টারজেনের কথা আসলে অবশ্যই এডগার অ্যালান পো এর কথা এসেই যায়।

দি ন্যারেটিভ অব আর্থার গর্ডন পিম
মূল লেখক: এডগার অ্যালান পো
অনুবাদ: খসরু চৌধুরী

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.