রাহাত ভাই – ১

রাহাত ভাইয়ের সাথে পরিচয়টা ছিল একদম অন্য রকম ভাবে। অবশ্য এই সাইক্লিং অথবা অ্যাডভেঞ্চার কর্মকাণ্ডের কারণে বেশিরভাগ লোকজনের সাথেই পরিচয় হয়েছে অন্যরকম ভাবে। আগের পরিচয়গুলা ছিল সামনাসামনি এখনকার পরিচয়গুলা হয়ে গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে, তারপর দেখা। আগে এই বিষয়গুলা ছিল না।

রাহাত ভাইয়ের সাথে পরিচয়ের সূত্রপাতটা ছিল একটু অন্যভাবে। ২০০৮ সালের দিকে যখন তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ সাইকেল ভ্রমণের প্ল্যান করছিলাম। তখন শেষ সময়ে মনা ভাই একটা স্পন্সর যোগাড় করে ফেলেছিলেন তাঁর বড় ভাইদের মাধ্যমে। তখন এই জগতের কাউকেই আমি চিনি না। স্পন্সর যোগাড় হওয়ার পরে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রসিডিউর চলে আসে। যেমন স্পন্সরের টি-শার্ট পরে সাইকেল চালাতে হবে, ব্যানার থাকবে।

টি-শার্টের বিষয়ে মনা ভাই তখন নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের রুবেল ভাইয়ের সহযোগিতা নিয়েছিলেন। রুবেল ভাই তখন দুই জায়গায় বসতেন। কাটাবনের বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটে যেটাকে সবাই পশু-পাখির মার্কেটও বলে, সেটার দ্বিতীয় তলার কোন একটা দোকানে আর এলিফ্যান্ট রোডের সুবাস্তু আর্কেড নামের একটা বিশাল বিল্ডিংয়ের ৪ অথবা ৫ তলায়, ৬ তলায়ও হতে পারে। এলিফ্যান্ট রোডের মার্কেটে সম্ভবত রুবেল ভাইয়ের কম্পিউটারের এক্সিসরিজ অথবা ঐ টাইপের কিছু একটার ব্যবসা ছিল। কাটাবনের মার্কেটে কিসের ব্যবসা ছিল মনে নাই।

আমাদের টি-শার্টগুলা স্ক্রিন প্রিন্ট করা হয়েছিল। মনা ভাই সম্ভবত দোকানের নাম্বার বলে দিয়েছিলেন সেখানে খুঁজে খুঁজে বের করেছিলাম। সেই দোকানে প্রথম রুবেল ভাইয়ের সাথে দেখা। এর পরে আরেকদিন সন্ধ্যার পরে গেলাম টি-শার্ট আর নিশান সংগ্রহ করার জন্য। মনা ভাইয়ের আসতে দেরি হচ্ছিল দেখে দোকানে কিছুক্ষণ বসেছিলাম। সেখানেই প্রথম রাহাত ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল। রুবেল ভাই পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় বলেছিলেন রাহাত একা একাই ঘুরে।

ঐ সময় আমাকে দেখে কি ভেবেছিলেন জানি না। আমার বয়স ছিল তখন খুবই কম, একদমই বাচ্চা একটা ছেলে। মাত্র দাড়ি-গোফ উঠেছে মাত্র। তবে পরবর্তীতে রাহাত ভাইয়ের সাথে এত বন্ধুত্ব হয়েছিল যে সেটা বলার মতো না। এখনো মনে সিনিয়রদের মধ্যে খুব কাছের বড় ভাই যদি বলি তো মনা ভাই রাহাত ভাইয়ের কথা প্রথমে আসবে। তাঁদের সাথে অনেকদিন পর পর দেখা হলেও মনে হয় গতকালই দেখা করে আসছি।

এত বড় একটা এক্সপেডিশনে যাচ্ছি দেখে রাহাত ভাই জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমার অভিজ্ঞতার কথা। যখন বলেছিলাম কিছুই করি নাই, তখন আবার বলেছিলেন কোন সমস্যা নাই মনা ভাই যখন আছে চিন্তার কিছু নাই। তাঁর পিছন পিছন চললেই হবে। এর কিছুক্ষণ পরে মনা ভাই আসার পরে আর কথাবার্তা খুব একটা আগায় নাই। উনাদের পাহাড়ে যাওয়ার বিষয়ক কথাবার্তা মুগ্ধ হয়ে শুনতেছিলাম। আর ভাবতেছিলাম এঁদের মতো যে কবে এমনভাবে অনেক কিছু একটা করতে পারবো।

এর পরে রাহাত ভাইয়ের সাথে কয়েকটা অসাধারণ এক্সপেডিশনে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন নৌকা ভ্রমণটা থাকবে একদম প্রথমে। এ ছাড়াও দুয়েকটা এক্সপেডিশনে আমার যাওয়ার কথাও ছিল না, তিনি নিজে থেকে আমাকে আলাদা করে নিয়ে গেছেন। আর প্রত্যেকটা এক্সপেডিশনে সব সময় চেষ্টা করতাম রাহাত ভাইয়ের আশেপাশে থাকতে। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি, আর অনেক কিছু শেখা, আদর পাওয়ার জন্যই রাহাত ভাইয়ের আশেপাশেই থেকেছি সব সময়।

আমার এক ধরণের সৌভাগ্য বলবো, আমি আমার অ্যাডভেঞ্চার অথবা ভ্রমণের শুরুর দিকেই অসাধারণ কিছু বড় ভাই পেয়েছিলাম যাঁরা আমার মেন্টর হিশাবে কাজ করেছে। এই সংখ্যাটাও কম না এবং যাঁর যাঁর জায়গা থেকে নিজেরা সব অসাধারণ কাজ করেছেন। বাবু ভাই, টুটু ভাই, মনা ভাই, রাব্বি ভাই, ফয়সাল ভাই, মুনতাসির ভাই, পিংকি আপু, মৃদুল ভাইসহ আরো অনেকে, যাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। যাঁরা প্রতি নিয়ত আমার মেন্টর হিশাবে কাজ করেন।

রাহাত ভাইও আমার কাছে একজন মেন্টর হিশাবে কাজ করেছেন। এখন রাহাত ভাই হয়তো বিনয় করে এখানে নিচে কমেন্ট করে বলে দিবেন তিনি আসলে কিছুই করেন নাই। মেন্টররা আসলে সাধারণত এমনই হয়।

এখানে দুই একজন মহান মানুষের কর্মকাণ্ডের উদহারণ ব্যাখ্যা করলে হয়তো বুঝা যাবে। যেমন ধরা যাক জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। তাঁর একটা কি দুইটার বেশি লেখা হয়তো পাওয়া যাবে না। কিন্তু তিনি আমাদের মাঝে এখনো বেঁচে আছেন অন্য একটা কারণে। তিনি সবাইকে বই দিতেন আর সব সময় বলতেন এই বইটা পড়বেন। আহমদ ছফার আবদুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে লেখা ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটা পড়লেই বুঝা যাবে তিনি ছোট ছোট কিছু কাজ করেছেন কিন্তু এইসব কাজ ছোট ছোট মানুষকে অনেক বড় এবং অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

তারপরে দেখা যায় আহমদ ছফা সারা জীবন নতুন নতুন লেখকদের ইন্সপায়ার করে গেছেন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের যখন প্রথম লেখা প্রকাশ হয় তখন আহমদ ছফা স্যারকে এক টাকা উপহার দিয়েছিলেন, আর বলেছিলেন লেখা চালিয়ে যাও। অথবা অনেক দৌঁড়াদৌঁড়ি করে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বইটা প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

উপরে যাঁদের নামগুলা উল্লেখ করেছি সবাই এভাবেই মেন্টর হিশাবে কাজ করেছে। এই লেখাটা রাহাত ভাইয়ের সাথে পরিচয়ের সূচনার সময়কার লেখা বলা যায়। পরবর্তীতে আরো কিছু কিছু লেখা আমি লিখবো। সেখানে তাঁদের ছোট ছোট কথাও যে আমার জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে এবং কিভাবে প্রভাব ফেলেছে সেগুলা বলার চেষ্টা করবো।

আর তাঁদের ঐসব কথা হয়তো আমার বিভিন্ন লেখায় চলেও আসছে আমার নামে। কিন্তু আমি তো শুধু একলাই আমি না। সবাইকে নিয়েই আমি, সবার প্রভাবেই এই আমি তৈরি হয়েছি। সেটা আমি ভাল হই আর খারাপ হই যেটাই হোক না কেন!

২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.