অক্ষর বিন্যাস

আমার যখন কম্পিউটারে প্রথম হাতেখড়ি হয় বিশেষ করে অক্ষরবিন্যাসে। তখন অফিসের এক বড় ভাই ছিলেন জামান ভাই, তাঁর বাড়ি ছিল চাঁদপুর। তাঁকে দেখতাম খুব দ্রুত কম্পোজ করতে পারতেন। অবাক হয়ে দেখতাম আর ভাবতাম কবে যে তাঁর মতো টাইপ করতে পারবো!
একদিন এই কথা রাসেল ভাইকে বলার পরে রাসেল ভাই সাহস দিয়ে বলেছিলেন, নিয়মমতো এবং নিয়মিত অনুশীলন করলে জামান ভাইয়ের চাইতেও দ্রুত পারবো। প্রশ্ন করেছিলাম, ‘সেটা কিভাবে?’ রাসেল ভাই বলেছিলেন ব্যাকরণ মেনে করতে হবে। অক্ষরবিন্যাসেও আবার ব্যাকরণ এইটা আবার কি জিনিশ!
রাসেল ভাই তখন ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাইলেন জামান ভাই টাইপ করেন দুই আঙ্গুলে। যুক্তি দিয়া বুঝাইলেন আমি যদি জামান ভাইয়ের মতো দুই আঙ্গুলে কম্পোজ করি, তাহলে অনেক চেষ্টা করে হয়তো জামান ভাইয়ের কাছে যেতে পারবো কিন্তু কোনদিন তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারবো না। আমাকে কাজ করতে হবে দশ আঙ্গুলে। এই বিষয়টা আমার মাথার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। আসলেই তো দুই আঙ্গুল কিভাবে দশ আঙ্গুলের সাথে পারবে? আমি তখন মন-প্রাণ দিয়া দশ আঙ্গুলে টাইপ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলাম। এইটা আমার খুবই কাজে লাগছে।
সারাবছর সব কাজ করার পরে দেখা যেত বই বের করার সময় ফিনিশিং কাজটা করতে আসতেন মাসুদ নামে একজন। মাসুদ ভাই বিকালের পরে আসতেন, ফর্মা সেটিং করতেন আর ফাইনাল প্রুফটা তুলে দিতেন। মাসুদ ভাইকে দেখার পরে মনে হইত কবে যে মাসুদ ভাইয়ের মতো কাজ করতে পারবো। এভাবেই আমার সামনে একজনের পরে একজন আসছে আর আকাঙ্ক্ষা তৈরি হইছে আরেকজনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অথবা কাছাকাছি যাওয়ার। আর নতুন নতুন ক্ষুধা তৈরি হইত।
আমাদের সকল কাজ শেষ হওয়ার পরে প্রেসে যাওয়ার আগে ট্রেসিংয়ে প্রিন্ট দিতে হইত। সেই ট্রেসিং নিয়া প্রেসে যেতে হইত। আমরা ট্রেসিং নিতাম আজিজ মার্কেটের দোতলা থেকে। দোকানের নাম ছিল ‘কালজয়ী’। সেখানে আরেকটা অসাধারণ মানুষ কাজ করতেন, ফারুক ভাই। ফারুক ভাইয়ের বাড়ি ছিল চাপাইনবাবগঞ্জ। তাঁর কথার টানে সব সময় চাপাইয়ের টান থাকতোই।
আমার প্রায়ই আজিজে যেতে হইত বিভিন্ন বইয়ের দোকান থেকে বিল তোলার জন্য। এখন অবশ্য সেই বইয়ের দোকানগুলা আর নাই। অথবা বেশির ভাগই নাই। আজিজে গেলেই ফারুক ভাইয়ের দোকানে ঢুঁ মারতাম। টুকটাক গল্প করতাম। গল্পের মাধ্যমে জানতে পারছিলাম মাসুদ ভাইও এখানেই কাজ করতেন। আর ফারুক ভাই ছিলেন গল্পবাজ মানুষ। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করলেই নানা রকম গল্প জুড়ে দিতেন।
যেমন একদিন গল্পে গল্পে বললেন, ‘শরীফ ভালো নাইরে ভাই, কবিদের নিয়া আর পারি না।’ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেন ভাই কি হইল আবার?’ তাঁর উত্তর, ‘আরে আর বইল না, এঁরা এত কারেকশন করে। কারেকশনের শেষ নাই। দশবার পনেরবার প্রুফ তুলে। আর যখন ফাইনাল হয় তখন দেখা যায়, প্রথমে যেটা লিখছিল আবার সেই জায়গাতেই ফিরে আসছে। কও তো দেখি এই যে দশবার পনেরবার আমারে দিয়া খাটাইল এতে লাভটা কি হইল?’ তারপর দুইজনেই খুব হাসাহাসি করে নিজের কাজে ফিরে আসতাম।
আর দেখা হইলেই শুধু বলতেন একটা ধৈর্য্যশীল ছেলে দাও। প্রায়ই বলতেন তুমি চলে আসো। দুই ভাই মিলে কাজ করবোনে। কিন্তু উনাকে দেখতাম সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতেছেন এত সময় নিয়ে কাজ করার আমার জন্য সত্যি কঠিন ছিল। তারপরও উনি বারবার আমাকেই চাইতেন।
তারপর আস্তে আস্তে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ একদম কমে গেল। তখন মাঝে মাঝে আজিজে গেলে খোঁজখবর নিয়া আসতাম। ভিতরে ঢুকে দেখতাম সেই পুরানো কম্পিউটার, পুরানো সেটাপ। কতকিছু আধুনিক হয়ে গেল কিন্তু তিনি আর আধুনিক হন নাই। আমি অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ-৭ ব্যবহার করতেছি, কুয়ার্ক এক্সপ্রেস আপডেট ভার্সন ব্যবহার করতেছি আর তিনি তখনও দেখি ৯৮ ব্যবহার করতেছেন। একটা কম্পিউটারে ৯৮ আরেকটা কম্পিউটারে এক্সপি। আর কুয়ার্ক এক্সপ্রেসও সেই ২০০৩ কি ২০০৪ ভার্সন। আর অনেক কাজ ওয়ার্ডেই করে ফেলতেছেন। যা আমরা চিন্তাও করতে পারি না। কিন্তু কোন কাজই কোন অংশে কম না।
এর পরে আর আমাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হইত না তবে মাঝে মাঝে ফোনে কথাবার্তা হইত। একসময় ফোনের কথাবার্তাও বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ করে কাজ করতে করতে ফারুক ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। ফোন দিয়ে দেখলাম আগের নাম্বার আছে কিনা। দেখা গেল আগের নাম্বারই আছে। ফোন ধরেই বললেন, ‘আরে কাউয়ার শরীফ যে।’
জানা গেল ফারুক ভাই আর আগের পেশায় নাই। চাপাইনবাবজগঞ্জ নিজ গ্রামে চলে গেছেন, সেখানে কৃষিকাজ করেন।
এভাবেই কালজয়ী প্রতিষ্ঠানের মতো অক্ষরবিন্যাস পেশাটা আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
কালজয়ী এখন পুরানো বইপত্রে কালের সাক্ষী হয়ে শুধু একটা নাম ‘কালজয়ী’ হয়ে থাকবে…
৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.