লম্বা চুল

শিরোনাম পড়ে হয়তো প্রথমেই ভাবতে পারেন আমার নিজের লম্বা চুল রাখার কোন এক ইতিবৃত্ত লিখতে বসেছি। তাই এই আগেই বলে নেয়া হল, এটা নিজের লম্বা চুল রাখার কোন ইতিহাস না। তবে লেখাটা লম্বা চুল বিষয়েই। নিজের লম্বা চুল নিয়ে আরেকদিন লিখবো।

গত কয়েকদিন ধরে মাথায় ঘুরতেছিল, লম্বা চুল দেখতে আমার কেন ভাল লাগে, বিশেষ করে মেয়েদের। অনেক ভেবে চিন্তেও এটার কোন কূল কিনারা পাওয়া গেল না। তবে দর্শনগত দিক দিয়া একটা জায়গায় শেষ পর্যন্ত আটকে গেলাম। সেই কথায় আরেকটু পরে আসতেছি, কোথায় গিয়ে আটকালাম।

লম্বা চুল আমার বরাবরই খুব পছন্দ। এটা কেন কিভাবে হয়েছে ঠিক জানি না। তবে ছোটবেলাতেই দেখে আসছি, মা-চাচীরা অথবা বড় বোনরা এই বিষয়ে বিশেষ চর্চা করতেছেন। এর যতেœর পিছনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতেছেন। বিশেষ করে গ্রামে তো একজন আরেকজনের চুলে তেল দেয়ার পাশাপাশি গল্প করার মতো ঘটনা খুবই সাধারণ। সেখান থেকেও হয়তো মনের অগোচরে এটা ঢুকে গিয়েছিল।

একেকজন মানুষের একেক রকম রুচি। আমার কাছে যে জামাটা পছন্দ আরেকজনের কাছে সেটা হয়তো একদমই পছন্দ না। এই রকম চুলের বিষয়ে হয়তো তাই। কারো ছোট চুল পছন্দ কারো মাঝারী আবার কারো হয়তো অতিরিক্ত লম্বা পছন্দ। কিন্তু অতিরিক্ত লম্বা চুল সবার হয় না। আমাদের গ্রামে এমনও কিছু কিছু গল্প চালু ছিল, মা-চাচীদের কাছে শোনা, শুধু লম্বা চুলের জন্য অনেক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। হয়তো দূর থেকে কোন ছেলের বাবা অথবা চাচা অথবা মা-চাচী শুধু মাত্র মেয়ের চুল দেখে মেয়ে পছন্দ করে ফেলেছে, চেহারা না দেখেই। এই ধরনের গল্প শুনতে শুনতে হয়তো মাথার মধ্যে এই লম্বা চুলের বিষয়টা ঢুকে যেয়ে থাকতে পারে।

আমাদের বাড়িতে সবার যে বড় ভাবি, তাঁর চুল ছিল অস্বাভাবিক লম্বা। এমন লম্বা চুল খুব কম মানুষদের আমি দেখেছি। ভাবির ৫ মেয়ে এবং ১ ছেলে। দুই মেয়ে ছাড়া সবাই আমার বয়সে বড় ছিল। সবাই বড় কিন্তু সম্পর্কে ভাতিজী হওয়ার কারণে দেখা গেছে সবাইকেই কাকা আর ফুপু ডাকতাম। সেই দুই বড় দুই ফুপুর মধ্যে দুইজনের চুলই ছিল অসম্ভব রকমের লম্বা। দুই ফুপুর মধ্যে একজনের নাম ছিল রানু আরেকজনের রিনি। রানু ফুপুর চুল ছিল সবচাইতে লম্বা আর ঘন কালো। অনেক লম্বা বলতে একটু ব্যাখ্যা করলেই বুঝা যাবে, রানু ফুপুর উচ্চতা যদি হয় ৫ ফিট হয় তাহলে উনার চুল সাড়ে চার ফিটের কম না। আরেকটু বড় হলে মাটিতে লেগে যাবে এমন অবস্থা।

এই রকম রানু ফুপুর মতো লম্বা চুল দীর্ঘদিন কোথাও দেখি নাই। যখন অ্যাডভেঞ্চার লাইনে ঢুকলাম, ঘুরাঘুরি করতে করতেই পরিচয় হয়েছিল পিংকি আপুর সাথে। বহু বছর পড়ে এসে সরাসরি অনেক লম্বা চুল দেখলাম পিংকু আপুর মাথায়। মুগ্ধ হওয়ার মতো লম্বা। ততদিনে নিজেরও অল্প লম্বা চুল রাখা হচ্ছে। চুল লম্বা রাখা, তারপর যতœ নেয়া থেকে শুরু করে অনেক কষ্ট করতে হয়। এই কষ্ট যাঁরা করে তাঁদের উপর আলাদা একটা শ্রদ্ধাবোধ চলে আসে। আর এত কষ্টের পরে তো একটা সৌন্দর্য অবশ্যই ফুটে উঠে। কিন্তু সেটা সবার কাছে হয়তো ভাল নাও লাগতে পারে। পিংকি আপু হঠাৎ একদিন তাঁর চুল কেটে অর্ধেক করে ফেললেন। তাঁর চুল কাটার পরে ফেসবুকে দেয়ার পরে দেখা গেল অনেকেই এপ্রিসিয়েট করেছেন। আবার অনেকে একটু মনও খারাপ করেছেন। আমি মন খারাপ হওয়ার পক্ষেই ছিলাম।

আমরা ছোটবেলায় প্রতি বছর গ্রামে যেতাম গরমের ছুটিতে। তখন আমি প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। খুব একটা বুঝি অথবা সব কিছু মনে আছে বিষয়টা এমনও না। আমরা সবাই গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। আমরা গোসল করতাম নদীতে। নদী বাড়ি থেকে ৭/৮ মিনিট দূরের পথ। সেখানে একটা দুর্ঘটনায় আমার বড় ভাই মারা যান পানিতে ডুবে। ঐ মৃত্যু নিয়ে নানারকম গল্প শুনেছি। একই ঘটনা যে নানারকম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যেতে পারে সেটা সেদিন ভাল বুঝতে পেরেছিলাম।

সবাই মিলে একসাথে গোসল করতে গিয়েছিলাম আমরা। বড় ভাই তখন মাত্র এসএসসি পরিক্ষা দিয়েছে। মেঘনার ছোট শাখা নদীতে এপার উপার সাঁতার কেটে আসে যায়। ভাইয়াও পারতো এই কাজটা করতে, আগের দিনও গিয়েছিলেন ঐ পারে, আবার ফিরেও আসছিলেন। কিন্তু ঐদিন হঠাৎ করে ডুবে যাচ্ছিল, এমন একটা জায়গা ডুবতেছিল সেখান থেকে রানু ফুপুর দূরত্ব দুই হাত দূরে। ফুপু হয়তো বুক পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর থেকে দুই হাত দূরে ছিল ভাইয়া। ফুপু তাঁর নিজের লম্বা চুল ছুড়ে মেরেছিলেন। কিন্তু ভাইয়া সেই চুল ধরে নাই, কেন ধরে নাই সেটা আজও একটা রহস্য! হয়তো এই রহস্যর নামই আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর যাই বলি না কেন!

আমার খুব খুব পছন্দের মানুষ না হলে কখনো কাউকে এই লম্বা চুলের কথা বলি না। যেখানে কখনোই নিজের পছন্দ কাউকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি না, সব সময় চেষ্টা করি সবার স্বাধীনতা নিয়ে চলুক। কিন্তু অল্প কিছু বিষয়ের মধ্যে খুব পছন্দের মানুষদের এই বিষয়টা নিয়ে নানাভাবে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করি যেন চুলটা লম্বা রাখে, একটু কষ্ট হলেও যেন না কাটে।

বড় ভাইয়ের কথা চিন্তা করলে হয়তো এইটা একটা কষ্টের জায়গা হওয়ার কথা, লম্বা চুল দেখলেই হয়তো বড় ভাইয়ের সেই মৃত্যুর কথা মনে হওয়ার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মন খারাপ হয় না। কেন হয় না জানি না, বরং উলটা ভাল লাগে, মানুষের মন বড়ই বিচিত্র।

পছন্দের মানুষ চুল কাটলে মনে হয় হৃদয়টা ভেঙ্গে গেছে…

এটা আর জোড়া লাগবে না…

৯ বৈশাখ ১৪২৮

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.