যখন পুলিশ ছিলাম, যখন নায়ক ছিলাম

২০০৮ সালে তেঁতুলিয়া টেকনাফ সাইকেল ভ্রমণ শেষ হয়েছিল টেকনাফে। সেটাই আমার প্রথম টেকনাফ ভ্রমণ বলা যায়। তখন সেখানে অল্প সময় ছিলাম। মনা ভাই সেই অল্প সময়ের মধ্যেই থানার কাছে মাথিনের কূপ দেখানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার কাছে খুব সাধারণই মনে হলো।

পরবর্তীকালে আরেকটা ট্রিপ হয় নৌকায় ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন। সেই ভ্রমণে সেন্টমার্টিনে পৌঁছানোর পরে সবাই ফিরে আসলেও আমি রাহাত ভাই আর বাবু ভাই সেন্টমার্টিনে আরো দুই দিনের জন্য থেকে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় টেকনাফে নেমে আবার মাথিনের কূপে গিয়েছিলাম। সেই সময়ই জানতে পেরেছিলাম মাথিনের কূপের যে নায়ক ধীরাজ ভট্টাচার্য তাঁর লিখিত দুইটা বই আছে। একটা ‘যখন পুলিশ ছিলাম’, আরেকটা ‘যখন নায়ক ছিলাম’। দুইটাই জীবনী।

বাবু ভাই ছাড়াও আরেকটা মানুষ আমাকে এই দুইটা বই পড়তে বলেছিলেন। সেটা হইল জিয়া ভাই। জিয়া ভাই বেশকিছু বই পড়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। সেই বেশকিছু বইয়ের মধ্যে এই দুইটা বইও ছিল। কিছুদিন আগে রাসেল ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলাম প্রকাশনা সংক্রান্ত কাজে। তখন তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে এই দুইটি বই ধার নিয়ে আসলাম।

বই দুইটি জীবনী হলেও আমার কাছে একদম উপন্যাসের মতই লাগলো।বিশেষ করে ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ গ্রন্থে উপন্যাস আর থ্রিলিং দুইটা বিষয়ই উপস্থিত ছিল। আগে অন্যান্য বিষয়ের বই পড়তে ভাল লাগলেও বর্তমানে পছন্দের বিষয় জীবনীতে এসে ঠেকেছে।

দুই বইয়ের মধ্যে প্রথমটিই হলো ‘যখন পুলিশ ছিলাম’। তারপরের খণ্ড ‘যখন নায়ক ছিলাম’। ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ বইয়ের একটা বড় অংশই ছিল চট্টগ্রাম আর টেকনাফকে কেন্দ্র করে। পুলিশে থাকা অবস্থার তখনকার সময়ের নানাবিধ বিষয় উঠে এসেছে। পুলিশে এসেছিলেন তাঁর বাবার আগ্রহে। তাঁর ইচ্ছা ছিল নায়ক হওয়ার বা অভিনয় করার। কিন্তু বাড়ি থেকে অভিনয়ের বিষয়টা পছন্দ করতেন না। অনেকটা জোর করেই পুলিশে দিয়েছিলেন। বাবার ইচ্ছাতে পুলিশে যাওয়া আবার বাবার অনুমতি নিয়েই পুলিশের চাকরী থেকে বিদায় নিয়ে আবার অভিনয়ে যুক্ত হওয়া।

পুলিশে ঢুকে প্রথমে কলকাতায় কাজ করেছেন। সেখানে একই সঙ্গে দোটানায় ছিলেন। বিশেষ করে স্বদেশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তাঁদের কাজ করতে হয়েছে বৃটিশ সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে। একটা সময় তাঁকে ট্রান্সফার করে চট্টগ্রাম পাঠানো হয়। সেখানে আবার বড় কর্তার বউ ধীরাজকে পছন্দ করতেন। সেই কারণেই বলা যায় শাস্তিস্বরূপ তাঁকে একদম টেকনাফ পাঠিয়ে দেয়া হয়। তখন স্টিমারে চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ যেতে সময় লাগতো আড়াই দিন।

টেকনাফে তখন মগ জাতির বসবাস ছিল প্রচুর। বাঙ্গালিদের পক্ষে মগ ভাষা বুঝতে পারা অবশ্যই দুষ্কর। এর মধ্যে স্টিমারে অতিরিক্ত দুলুনীতে চার বছরের এক বাচ্চা বঙ্গোপসাগরে পড়ে নিখোঁজ হয়। সেখানকার মায়ের কান্নার বর্ণনায় ধীরাজ লিখছেন, ‘ভাষা যার যতো দুর্বোধ্যই হোক, সন্তানের বিয়োগ-ব্যথা প্রকাশের ভাষা সব দেশের মায়েদেরই এক এবং ওটা বুঝতে এতোটুকুও কষ্ট হয় না।’

টেকনাফে গিয়ে অদ্ভুত একটা বিষয় আবিষ্কার করেন ধীরাজ। সেটা হল এখানে মেয়েরা কাজ করে আর ছেলেরা ঘরে বসে থাকে। এই ঘটনা বর্ণনা করে ধীরাজ এক জায়গায় লিখেন, ‘একেই বুঝি বলে মগের মুল্লুক।’

এরপর সেখানেই দূর থেকে দেখেই পছন্দ করে ফেলে মাথিনকে। দুইজনের মধ্যে কোনদিন কথা হয় নাই। কিন্তু প্রেম ঠিকই হয়ে যায়। সিনেমা উপন্যাসের মতো এখানেও একজন ভিলেন আছে। তার কারণেই মূলত তাঁদের এই প্রেমটার পরিণতি হয় না। বাবার চিঠি পেয়ে ধীরাজ মাথিনকে না জানিয়েই কলকাতা ফিরে যায়। সেখানেই চিঠির মাধ্যমে খবর পান মাথিন ধীরাজের বিরহে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেন এবং এক সময় মারা যায়। তবে এই বইয়ে অবলীলায় তাঁর সকল ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। মনে হয়েছে কোথাও কোন কিছুই লুকান নাই। মিথ্যা বলেন নাই। যেমন শেষ পাতায় নিজেকে সবার কাছে কাওয়ার্ড হিশাবেই পরিচয় দিয়েছেন।

‘যখন পুলিশ ছিলাম’ বইয়ের পরবর্তী খণ্ড ‘যখন নায়ক ছিলাম’। এখানেও তাঁর জীবনের নানার রকম ঘাতপ্রতিঘাতের ঘটনা এসেছে। এসেছে প্রেমের কথাও। এবং আবার প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাও আছে। আছে নির্বাক সিনেমা থেকে সবাক সিনেমার উত্থানের ঘটনা। এখানেও আছে অসাধারণ কিছু কথাবার্তা। যেমন একটা ঘটনার পরে তাঁর বাবা এক যায়গায় বলছেন, ‘একটা কথা তুমি কোন দিনই ভুলে যেও না ধীউ বাবা, সংসারে দুঃখ-দারিদ্র্যের ভিতর থেকে যারা বড় হয়, তারাই সত্যিকারের মানুষ হয়। জীবনটাকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারে শুধু তারাই। নইলে রুপোর চামচে মুখে করে জন্মে যে সব আলালের ঘরের দুলালরা ঐশ্বর্যের গদির উপর বসে ধরাকে সরা জ্ঞান করে, কতটুকু মূল্য তাদের জীবনের? যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যে সৈনিক বিজয়ী হয়ে ফিরে আসে, জয়ের আনন্দ পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারে শুধু সে-ই। না হইলে দাঁড়ানো মাত্রই যদি অপরপক্ষ নতি স্বীকার করে অথবা শান্তির প্রস্তাব করে বসে, সে যুদ্ধ জয়ের কোন গৌরব বা আনন্দ নেই। আজ আমি তোমার এই আশীর্বাদ করছি, জীবনযুদ্ধে দুঃখ-দারিদ্র্যের কাছে নতি স্বীকার না করে তুমি বড় হও, সত্যিকারের মানুষ হও। তখন পিছন ফিরে তাকালে দেখতে পাবে পায়ে মাড়িয়ে আসা কাঁটাগুলো ফুল হয়ে হাসছে।’

পুলিশের চাকরী ছাড়ার পরে অভিনয়ের শুরুতে ভালই নামডাক পেয়ে যান। সেই সময়ে গোপা নামের একজনের সঙ্গে তাঁর এক ধরনের প্রেম হয়। কিন্তু এই প্রেমটাও শেষ পর্যন্ত টেকে নাই। এখানেও তিনি নিজেকেই দায়ী করেন। তাঁর নামডাকের সময়টা ছিল সিনেমার নির্বাক যুগ। তাঁর অভিনিত একটি নির্বাক সিনেমা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’। এই সিনেমায় অভিনয় করার জন্য সিরাজগঞ্জ আসতে হয়। সেখানে তাঁর জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করেন। তখনকার দিনের এপার বাংলার দুঃখ-দুর্দশার কথা উঠে এসেছে।

নির্বাক থেকে সবাক সিনেমা ফিরে আসার পর তিনি নানা রকম সমস্যার মধ্যে দিয়ে যান। এর মধ্যে বাবা মারা যান। কোন সবাক সিনেমায় ডাক পাচ্ছিলেন না। অনেকদিনের পুরানো সিনেমা হাউজ থেকে নতুন সিনেমা হাউজে যোগদান। মায়ের ইচ্ছায় বিয়ে করা। শেষের দিকে সিনেমায় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতে করতে হাপিয়ে উঠেন। তিনি অন্য বিষয়ে অভিনয় করতে চান কিন্তু কোন পরিচালকই তাকে নায়ক ছাড়া কল্পনা করতে পারেন না। কিন্তু তিনি সব সময় চেয়েছেন অভিনেতা হতে, নায়ক হয়ে সারাজীবন অভিনয় করতে চান নাই। ভিলেন অথবা অন্যান্য চরিত্রও করার তার আকাঙ্ক্ষা ছিল। তার এই বইটা অবশ্য শেষ হয় সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের ইঙ্গিত দিয়েই। শেষ পর্যন্ত তিনি বহু আকাঙ্ক্ষিত একটি ভিলেনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। সেখানেই বইটি শেষ করেন।

আমার কাছে এমনিতে দুইটা বই-ই অসাধারণ লেগেছে। মনে হয়েছে লেখক মোটামুটি সব জায়গাতেই সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নিজের সংসার জীবন নিয়ে তেমন কিছুই লিখেন নাই। বিশেষ করে তাঁর বিয়ের পরে। সবচাইতে বেশি পছন্দ হয়েছে লেখার ধরন। অসাধারণ। মনে হয়েছে লিখলে এভাবেই লিখতে হয়। গল্পের ছলে নিজের জীবনের অনেক ঘটনা অবলীলায় বলে গেছেন।

দুটি বইয়েই একধরনের আহত কিছু গল্প বলে গেছেন বলা যায়। আমার লেখাটা শেষ করি তাঁর ‘যখন নায়ক ছিলাম’ বইয়ের প্রথম দিকের কয়েকটা লাইন দিয়ে–

আমার জীবন নদীতে জোয়ার নেই, শুধু ভাঁটা। অনাদি-অনন্তকাল ধরে একঘেয়ে মিনমিনে জলস্রোত বয়ে চলবে লক্ষ্যহীন, উদ্দ্যেশ্যহীন পথভোলা পথিকের মতো। বাঁকের মুখে ক্ষণিক থমকে দাঁড়াবে, আবার চলতে শুরু করবে গতানুগতিক রাস্তা ধরে। এ নদী শুকিয়ে চড়া পড়ে গেলেও জোয়ার কোনদিন আসবে না, এই বোধ হয় নিয়তির বিধান।

৩০ শ্রাবণ ১৪২৬

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.