তুই তুমি আপনি

প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক ছবি: ইন্টারনেট
প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক
ছবি: ইন্টারনেট

তুই তুমি আপনি এই সম্বোধনগুলো আমরা একজন আরেকজনকে ডাকার ক্ষেত্রে ব্যবহার করি। আরো খুলে বললে, এখানে তুই তুমি আপনি ডাকার মধ্যে এক ধরনের স্টেটাসও মেন্টিন করে। যেমন, বয়সে ছোট হলে আমরা তুই অথবা তুমি বলি। এখানে যদি আপন কাউকে তুই বলি সমস্যা নেই।

কিন্তু যদি অপরিচিত কাউকে তুই বলি তো সে মাইন্ড করতে পারে। পাশাপাশি আমরা কখনো মোড়ের দোকানের, চায়ের দোকানের ছেলেটিকে তুমি বা আপনি কম বলি। তুই বেশি বলে থাকি।

বিশেষ করে আমার ছোট বেলার কথা যদি বলি, যখন স্কুলে পড়তাম তখন এই তুই তুমি নিয়ে অনেক মারামারি হতো। একই ক্লাসে পড়লে তুই বলতামই সঙ্গে যদি উপরের ক্লাসের কাউকে দুর্বল পেতাম তাকেও তুই বলে বসতাম। সেই ছেলেটি যদি নিরীহ টাইপের হতো কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু সে যদি নিরীহ না হয়ে কয়েকজন বন্ধু নিয়ে ঘুরতো তাহলে সেটা মেনে নিতো না। এই ভাবে কেউ যদি আমাকে তুমি অথবা তুই বলতো যদি দেখতাম সে আমার সমবয়সী কিন্তু দুর্বল তাহলে তো কথাই নেই মাইর একটাও মাটিতে পড়তো না। সিনিয়র জুনিয়র নিয়ে মারামারি সবসময় লেগেই থাকতো।

এক সময় তুই তুমি থেকে এখন সবাইকে আপনি করেই বলা শুরু করেছি। এর জন্য অনেক বিড়ম্বনাতেও পড়তে হয়। অনেকেই অনুরোধ করে তুমি বলার জন্য। অনেকে জিজ্ঞেসও করে আমি সবাইকে আপনি করে বলি কেন? আজকে আপনি তুমির রহস্যটা পরিষ্কার করি। কেন আমি সবাইকে আপনি করে বলি অথবা বলার চেষ্টা করি—

অ্যাডভেঞ্চার গুরু কাজী হামিদুল হক ছবি: ইন্টারনেট
অ্যাডভেঞ্চার গুরু কাজী হামিদুল হক
ছবি: ইন্টারনেট

জীবনের প্রয়োজনে একসময় স্কুল ছেড়ে দিতে হলো। কাজে ঢুকতে হলো। কাজের খাতিরেই ঢুকতে হলো এলিফ্যান্ট রোডের এক অফিসে। অফিসে কাজকর্ম শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে। এখানে আমার কাজ ছিলো সবচাইতে নিম্ন শ্রেণির। লোকজনকে চা দেয়া, ঘরদোর পরিস্কার করা। তখন আমার কাছে এই কাজগুলো নিম্ন শ্রেণিরই মনে হতো। কারণ আমাদের সমাজ এই শ্রেণিবিভাজন করে রেখেছে শত শত বছর ধরে। ঐ অফিসে কয়েকদিন পর এক স্যার আসলেন, এসে আমাকে প্রথম আপনি সম্বোধন করেই বললেন, ‘স্যার এক কাপ চা দেয়া যাবে?’ আমি চা দিলাম। আমার সঙ্গে কাজ করতো এক চাচা, জাফর চাচা। তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সবচাইতে মুরুব্বি হলেন এই স্যার, নাম সলিমুল্লাহ খান। চাচার কাছ থেকে আরো জানতে পারলাম স্যার খুবই ভাল মানুষ। এবং সবাইকে আপনি করে বলেন।

আমি প্রথমে বিশ্বাস করি নাই। ভেবেছিলাম চাচা রসিকতা করে বলেছেন। কিন্তু ২/৩ মাস পরে দেখলাম স্যার আসলেই সবাইকে আপনি করেই বলেন। অথচ স্যারের বয়স হবে আমার বাবার সমান। এই রকম এত বড় মাপের একজন মানুষ সবাইকে আপনি করে বলেন, কি আশ্চর্য! এইসব কথা চিন্তা করতে করতে নিজেকে খুব ছোট মনে হলো, এই তুই তুমির জন্য কত মারামারি কত ঝগড়া করেছি নিজের এলাকায় স্কুলে। কোন কোন জায়গায় রক্তারক্তিও হয়েছে। স্যারের এই আচরনের আমি মোহিত হয়ে সবাইকে এখন আপনি করে বলি। কিন্তু স্যারের মতো পারি না, কিভাবে কিভাবে যেন সবাইকে আপনি বলা হয়ে উঠে না। যেমন, চারুকলার ইমনের চায়ের দোকানের ইমন, সাদ্দামকে তুই করে বলি। কেন জানি আপনি করে বলতে পারি নাই।

সলিমুল্লাহ খান  ছবি: সাখাওয়াত হোসেন হাওলাদার
সলিমুল্লাহ খান
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন হাওলাদার

স্যারের মতো হয়তো এত মহান মানুষ হতে পারবো না। যদি সামান্য একটা গুণ নিজের মধ্যে ধারন করতে পারি তাহলেই জীবনের সার্থকতা।

এই রকম মানুষ আরেকজনকে পেয়েছিলাম যিনি নিজের বাসার কাজের ছেলেটিকেও আপনি করে বলতেন, তিনি অ্যাডভেঞ্চার গুরু কাজী হামিদুল হক।

অনেকদিন পর ব্রাত্যু রাইসুর নেয়া সলিমুল্লাহ স্যারের এক সাক্ষাৎকারে জানতে পেরেছিলাম স্যার এই বিষয়টা শিখেছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারের কাছ থেকে। সাক্ষাৎকারটা পড়ে বুঝতে পারলাম কত বড় মানুষ হলে এত বড় চিন্তা করতে পারে! এই রকম মহান মানুষ পাওয়া আসলেই কঠিন।

Comments

comments

Comments

  1. আজকে থেকে শুরু করছি..। দেখিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.