চিন্তা

জরুরি অবস্থার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামের মাঠে এক ছাত্রের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একজনের কথা কাটাকাটি থেকে বড় একটা আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। দিনের বেলার আন্দোলন রাত হতে হতে বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে যায়। আমি তখন এলিফ্যান্ট রোডে কাকে কাজ করি। সারাদিন টিভির সামনে বসে বসে খবর দেখছিলাম। ঐ আন্দলনের প্রেক্ষিতেই পরবর্তীতে সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা থেকে সরে যায় অথবা সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রথম ধাপ বলা যায়।

রাতের দিকে যখন অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়, তখন তানিয়া আপাকে ফোন দিয়েছিলাম একটা উৎকণ্ঠা থেকে। তখন রাসেল ভাইয়ের মাধ্যমে তানিয়া আপাদের একটা গ্রুপ কাকে আসতেন আড্ডা দিতে বিভিন্ন কাজকর্ম করতে। তাঁরা বেশিরভাগই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন হলে থাকতেন। কাকে একসাথে কাজের সুবাধে কথাবার্তা বলতে বলতেই তানিয়া আপার সাথে বেশ ভাল একটা সম্পর্ক হয়ে যায়। অনেকটা আপন ভাই-বোনের মতো সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক থেকেই খুব সম্ভবত ফোন দিয়েই বলেছিলাম, এই আন্দোলনে না থেকে সেইফ সাইটে চলে যেতে। কারো বাসায় অথবা বাড়িতে চলে যাওয়ার জন্য। তখন তানিয়া আপা বলেছিলেন, ‘শরীফ ভাই আপনে এমন একটা কথা বলবেন তা আশা করি নাই।’ তখন চিন্তা করতেছিলাম আসলেই তো, যৌক্তিক আন্দলনে কেন তাঁকে সরে যেতে বললাম। এমন বলার কারণটা কি?

১৯৯৭ সালের দিকে পহেলা বৈশাখে বাসায় না বলে আমরা দুই ভাই পাঠাগারের বড় ভাইদের সাথে টিএসসির দিকে ঘুরতে চলে গিয়েছিলাম। বড় ভাইদের বলেছিলাম বাসায় বলে এসেছি, তাই ভাইয়ারও খুব একটা চিন্তাভাবনা না করেই আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল। বাসার লোকজন তখন সন্ধ্যায়ও না ফেরার কারণে ভীষণ চিন্তার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। বাসায় ফিরেছিলাম খুব ভয়ে ভয়ে। ভেবেছিলাম হয়তো আজ আম্মা মেরেই ফেলবে। ঐদিন কোন কারণে আম্মা মারে নাই, আবার অভিমান থেকে একটা কথাও বলে নাই। আব্বা শুধু বলেছিলেন, ‘কোথাও গেলে যেন বলে যাই, কখন আসবো সেটাও যেন বলে যাই। তাতে সবার চিন্তায় থাকতে হয় না।’

আমাদের বাসায় সব সময় একটা অঘোষিত নিয়ম ছিল সন্ধ্যার মধ্যে ফিরতে হবে। মাগরিবের আজানের পর খুব বেশিক্ষণ বাইরে থাকা যাবে না। শুধু আমাদের বাসায় না, সবার বাসাতেই এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ছিল তখনকার সময়। বর্তমানে কি অবস্থা জানা নাই। এই নিষেধাজ্ঞায় আমি প্রচ- বিরক্ত ছিলাম, বিশেষ করে আম্মার উপর। আর ভাবতাম কেন যে এইসব করে পরিবারগুলো!

গত সপ্তাহে বড় ভাইয়ের মেয়ে আসলো বেড়াতে। ও এর আগে মাত্র একবার কি দুইবার আসছিল। সপ্তাহখানেক থাকার পরে পরশু বিকালে চারটা সাড়ে চারটার দিকে এই বৃষ্টি-বাদলের সময় এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে বাইরে গেল। যাওয়ার আগে সুরাইয়া আমাকে দিয়ে নিষেধ করাইতে চাইছিল কিন্তু আমি রাজী হই নাই। আমি সবাইকেই একটু স্বাধীনতা দিতে চাই। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল একটু সামনে যাবে কাছেই বেশি দেরি হবে না, তাড়াতাড়ি চলে আসবে। কিন্তু সাড়ে ছয়টার সময়ও ফেরার নাম নাই। সুরাইয়া তখন ফোন দিল কিন্তু ফোনে পাচ্ছিল না। আমি খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না। অনেক্ষণ যাবত চেষ্টা করেও সুরাইয়া ফোনে পাচ্ছিল না।

সুরাইয়া তখন খুবই চিন্তায় পড়ে গেল। একবার টয়লেটে যায়, একবার রুমে আসে। একবার শুয়ে থাকে একবার উঠে আর এর মাঝে ফোনে চেষ্টা করেই যাচ্ছিল। সংক্রামিত রোগের মত সুরাইয়ার টেনমশন আমার মধ্যেও এসে ভর করে বসলো। এর মধ্যে সুরাইয়ার মাধ্যমে নরসিংদীতে বড় বোনের কাছে খবর চলে গেছে, সেখান থেকে বড় ভাইয়ের কাছে। আরো কিছুক্ষণ পরে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো। মনে হলো যেন চিন্তা কিছুটা কমে গেল, তারপরও বাসায় না আসা পর্যন্ত চিন্তা যাচ্ছিল না। বাসায় যখন ঢুকলো তখন মনে হলো চিন্তার পাহাড়টা যেন নেমে গেল, অনেক হালকা লাগলো।

তখন নতুন করে বুঝতে পারলাম আমাদের পরিবার, বাবা-মায়েরা কেন এত চিন্তা-ভাবনা করতো আমাদের নিয়ে। আমার বাবা যে কেন খুব শান্তভাবে নরম করে বলেছিলেন কোথাও গেলে বলে যাওয়া হয়, দেরি হলে যেন সেটাও বলি যাই। আসলে কোন কিছুর ভিতর দিয়ে একদম নিজে না গেলে সত্যিই এইসব বিষয়গুলা অনুভব করাটা খুবই কঠিন।

জীবন যা সহজে শেখাতে পারে, অন্য কোন কিছু এত সহজে শেখাতে পারে না…

 

৮ কার্তিক ১৪২৭

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.