পাসপোর্ট

আমার যখন প্রথম দেশের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেই দেশটার নাম ছিল শ্রীলঙ্কা। তখন আমার পাসপোর্ট ছিল না। সেই শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের বই যখন লিখতে বসি তখন দেখা গেছে দশ ভাগের এক ভাগ পাসপোর্ট কিভাবে পেয়েছি সেটার বর্ণনাই চলে গিয়েছিল। প্রায় ১৫ পাতা। প্রথম ধাপগুলা সহজে পার করলেও শেষের দিকে খুব ঝামেলা হইছিল। এতটাই সমস্যাজনক ছিল। বই বের হলে হয়তো সবাই বিস্তারিত পড়ার সুযোগ পাবে। শ্রীলঙ্কা থেকে ফিরে এসে মনে হয়েছিল পুরা শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১২০০ কিলোমিটার ভ্রমণ করেও এতটা কষ্ট হয় নাই।

এর পরে দ্বিতীয়বার পাসপোর্ট রিনিয়্যু করা হয়, তখন কোন ঝামেলাই পোহাতে হয় নাই। ১৪ দিনে পেয়েগিয়েছিলাম। যেহেতু এমআরপি থেকে এমআরপি রিনিয়্যু হয়েছিল তাই। আর কোন বারই কোন ধরনের দালালের কাছে যেতে হয় নাই, সব নিজে নিজেই করেছি।

এই বছর আবার পাসপোর্ট রিনিয়্যু করার সময় আসলো। এবারও কোন দালাল ধরার প্রশ্ন আসে না। আর দেশ যখন এতটা ডিজিটাল হয়ে গেছে, সব তো নিজেই করা যায়। ফেব্রুয়ারিতে অনলাইনে পাসপোর্টের ফরম পূরণ করার পর ডেট পেলাম এপ্রিলের পাঁচ তারিখে। অর্থাৎ প্রায় দুই মাস পর। কি কারণে একটা কাজে ধানমন্ডির কেয়ারি প্লাজায় গেলাম। সেখানে গিয়ে নতুন একটা তথ্য পেলাম। দোকানে ৫০০ টাকা দিলেই পরের দিনের ডেট পাওয়া যায়, এই হইল অবস্থা। একদম হুবহু এক সময়কার ভারতীয় ভিসার মতো অবস্থা। আমার অতটা তাড়া ছিল না। তাই ঐ পথে আর পা বাড়ালাম না।

কিন্তু কপাল খারাপ এপ্রিলের পাঁচ তারিখে লকডাউন দিল। পাসপোর্ট আর জমা দেয়া গেল না। কবে জমা নিবে তারও ঠিক ঠিকানা নাই। ফেসবুকে দুইটা গ্রুপে অ্যাড হইলাম খোঁজ জানার জন্য, যেন চালু হইলেই জমা দিতে যেতে পারি। গ্রুপে ঢুকেই পড়লাম দালালের এক আখড়ায়। টিওবির গ্রুপে এমন দেখতাম, ব্যবসা করা গ্রুপগুলা গোপনে ইনবক্সে লোক হাতাইত। এখানেও তাই, শকুনের মতো অপেক্ষা করে থাকে সবগুলা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল দেশে ডিজিটাল দালালে ভরে গেছে।

বিভিন্ন অফার, যেখানে কেউ কাগজপত্র জাম দিতে পারতেছে না, কিন্তু দালালরা ঠিক কাজ করতে পারতেছে। আমার সাথে তিনজন দালাল যোগযোগ করলো। একজন ছয় হাজার, একজন চার হাজার, একজন তিন হাজার টাকার অফার দিল। কৌতুহল বসত এদের সাথে কথাবার্তা বললাম ইনবক্সে। সবারই আগে আগে টাকা দিতে হয়। এক দালালের সাথে এমনি বললাম, ‘ভাই আগে কাগজপত্র জমা, তারপর টাকা।’ দালাল কিছুতেই রাজি না, আগে টাকা তারপর কাজ। আমাকে নানার রকম বয়ান দিল, ‘ভাই বিশ্বাস না করলে কেমনে কাজ করাবেন?’ আমারও একই উত্তর, ‘ভাই বিশ্বাস না করলে টাকা কামাই করবেন কিভাবে?’

যাই হোক এই গ্রুপে দালালদের বিশেষ নামে ডাকা হয়, ‘দরবেশ বাবা’।

একসময় লকডাউন সিথিল হইল। এই মাসের ৭ তারিখে কাগজপত্র জমা দেয়ার তারিখ পেলাম। ছবি, আঙ্গুলের ছাপসহ সব কাজ শেষ করে আসলাম। আজকে ম্যাসেজ আসলো পাসপোর্ট প্রস্তুত। কাল যাব পাসপোর্ট আনতে। শেষ পর্যন্ত কাগজপত্র জমা দেয়ার পরে দুই সপ্তাহে কোন ‘দরবেশ বাবা’ ছাড়াই কাজ করতে পারলাম। কিন্তু কিছু কিছু জেলায় নাকি দরবেশ বাবা ছাড়া কাজই করা যায় না।

দরবেশ বাবারা দেশটা শেষ করে দিল।

৯ আষাঢ় ১২৪৬

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.