একটি শোক সংবাদ

প্রায় ১৯/২০ বছর আগের ঘটনা। চাচাতো বোন শাহানা আপাকে ঢাকায় আনা হয়েছে। প্রেগনেন্সি বিষয়ক সমস্যা। এর মাত্র দুই/তিন মাস আগে আমার মা মারা গেছে। আমরা তিন ভাই-বোন ঢাকা মেডিক্যালে গেলাম, অন্য আত্মীয়-স্বজন তেমন কেউ ছিল না। দুলাভাই দেশের বাইরে, কাকা সিলেটে থাকে ব্যবসার কাজে। চাচী একাই নিয়া আসছে, বাড়িতে সংসার আছে, চাচীর আরো চার মেয়ে। ছেলেটাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসছে। ছেলের বয়স মাত্র ১০। এখানে দুইদিন থেকে চাচী চলে গেছে এবং কিছু টাকা পয়সা রেখে গেছে। এদিকে আপার পক্ষ্যে সম্ভবনা থাকা, বাসায় কাজ আছে। তখন ঠিক হলো আমরা দুইভাই আর চাচাতো ভাই থাকবো। চাচাতো ভাই রিপন মোটামুটি ১৯ টা দিন ছিল টানা। আমরা দুই ভাই ভাগাভাগি করে থাকতাম, ছোট ভাই রাতে থাকে আমি দিনে, ও দিনে থাকলে আমি রাতে। এভাবে ১২ দিন চলে গেল, বোন মেয়ে বাচ্চা জন্ম দিল, কিন্তু তাঁর জ্ঞান নাই, দেখতেও পারে নাই। জন্মের ২৩ ঘণ্টা পরেই বাচ্চাটা মারা গেলো। সেদিন রাতে ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব ছিল রাতে থাকার, সম্ভবত ৪ টার দিকে ফোন দিয়া জানাইল পাশের বাসায়। ছোট ভাইকে বললাম, ‘কাগজপত্র রেডি করে ফেলো, আমি আসতেছি।’
আব্বাকে জিজ্ঞাসা করলাম কি করবো? কোন দিনতো করি নাই এই টাইপের কাজ। বাবা ঠাণ্ডা মাথায় স্থির হয়ে বললো দুইটা অপশন আছে। লাশ নিয়া আজিমপুর চলে যাও, অথবা আনজুমানে ফোন দিয়া হাসপাতালের বিস্তারিত বললেই সব ওরা করবে সিদ্ধান্ত তোমাদের। কিন্তু এইটা আমার পছন্দ হইল না, সে তো বেওয়ারিশ না, আমরা আছি। যথারীতি সব কাজ শেষ হইল, অনেক কিছু শিখলাম।
এর ঠিক ২ দিন অর্থাৎ ১৪ দিন পরে আপাকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হল। আইসিওতে কাউকে ঢুকতে দেয় না, ভিতরে অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। মনে হইল আপা এ যাত্রায় হয়তো বেঁচে যাবে। কিন্তু আমরা আবিষ্কার করলাম, আইসিইউ থেকে লাশ ছাড়া কিছুই বের হয় না। আমাদের তিনজনের বয়সই খুব কম। আমরা বুঝে গেছি এখান থেকে কেউ লাশ ছাড়া বের হবে না। আপার কষ্ট দেখে, নিজেদের কষ্ট হত। শেষ পর্যন্ত আমরা নামায পড়ে দোয়া করতাম, ‘আল্লাহ তুমি কিছু একটা কর।’ শুনতে খারাপ লাগলেও আমরা এইটাই চাইতাম, সবাই দোয়া করতাম এই রকম যেন আর না হয়। মারা গেলে হুট করে চলে যাওয়া অনেক ভালো।
আল্লাহ বোধহয়, এই তিন মাসুম বাচ্চার দোয়া কবুল করলেন। ভোরে ফোন আসলো, ‘দাদা ভালো খবর’। আমরা ছোট দুই ভাই, ছোট বেলা থেকেই এমন ভাবে বড় হইছি, অনেক বিষয় বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারি। ঢাকা মেডিকেল থেকে আজিমপুর লাশ যখন এম্বুলেন্সে তুললো, লাশের বিশ্রি একটা গন্ধ, লাশের চাইতে খারাপ গন্ধ এই দুনিয়ায় আর নাই, অন্তত আমার কাছে নাই। এই রকম গন্ধ পাইছিলাম রানা প্লাজায় কাজ করার সময়। এই যে ইমোশন চলে যায়, শুধু মাত্র যাঁরা এই টাইপের কাজ করে শুধু তাঁরাই বুঝতে পারবে।
আজিমপুর পৌঁছানোর পর সব কাজ শেষে, যখন কবরে নেমে গেছি তখন মুরুব্বীরা বলল, ‘তুমি এটা করতে পারবা না।’ আমি কাউকে কিছু না বলে, বাসায় ফিরে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ঘটনা কি? আব্বা বললো যাঁর সাথে বিবাহের সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনা আছে সে কবরে নামতে পারে না। মামা আর চাচাতো ভাই দুইজনে মিলে কবরে লাশ নামাইল, আমরা গামছা দিয়ে ধরে নিচের দিকে দিয়েছিলাম।
২০১৮ সালে টিওবি ম্যাডভেঞ্চারম্যান নামে একটা প্রোগ্রাম করা হলো। ঐখানে কিছু কিছু অংশের পুরাপুরি দায়িত্ব আমার হাতে। বিশেষ করে টাকার হিসাব, এই বিষয়টা টিওবি সব সময় আমাকে দিয়া করিয়েছে, আমিও কখনও আপত্তি করি নাই। হঠাৎ করে চাচার ফোন খুব ভোরে। এই রকম খারাপ অবস্থা, শহরে নিতে হবে। গ্রামের ডাক্তারে হবে না, গ্রামে সাধারণত পাশ করা ডাক্তার থাকে না। হয় ফেল করা, না হয় আরেক শ্রেণির ডাক্তার যারা অনেক বছর ধরে কম্পাউন্ডারের কাজ করেছিল, এদেরকেও ডাক্তার বলা হয়।
কাকাকে বললাম একটা নৌকা রিজার্ব করে নরসিংদী রওনা দিতে আমরা সরাসরি নরসিংদী চলে আাসবো। আপা বলল তোমার দরকার নাই, আমি যাচ্ছি, আগে পরিস্থিতি বুঝি তুমি অফিস কর। আমি ছুটি নিচ্ছি। আমি অফিসে আসলাম ফোনে যোগাযোগ চলতে থাকলো। নরসিংদীর ডাক্তার জানালো কিছু টেস্ট করা দরকার এখানে যন্ত্রপাতী নাই। আপনারা প্রাইভেটে নিতে পারেন, তবে ঢাকায় নিলে সবচাইতে ভালো হবে। আপাকে বললাম এম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকা মেডিকেল রওনা দাও, কাছাকাছি পৌঁছে জানাও আমি চলে আসবো। ৭/৮ দিন পরে রিলিজ পেলাম আমরা।
এর মধ্যে কাউকে কিছু বলি নাই, শুধু আমার এক ভাইকে খুলে বললাম, ভাইয়া বলল ‘কাউকে কিছু বলার দরকার নাই। আমি সব ম্যানেজ করতেছি। তুই তোর মতো আঙ্কেলের দিকে খেয়াল রাখ। পাশাপাশি জিজ্ঞাসা করলো টাকা পয়সার কি অবস্থা?’ বললাম, ‘ব্যাংকে কিছু টাকা আছে, তুলে খরচ করবো।’ রাহাত ভাই বলল ‘ব্যাংকে গিয়ে সময় নষ্ট করার দরকার নাই। টিওবির কত আছে?’ ‘৬০ এর মতো’। সুস্থ হইলে আমাকেই ফেরত দিয়া দিস, এটার কথা কেউ জানবে না।
বাবাকে মোটামুটি সুস্থ অবস্থায় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ডাক্তার বলে দিলো, বয়স হইসে ৭৮/৭৯ এখন চাইলেও এটা সেটা খেতে পারবে না, হিসাব করে খেতে হবে। বাড়িতে যাওয়ার ২/৩ মাস পরেই, বাবাকে বড় ভাই টঙ্গি নিয়া গেল। সেখানে ৪ মাসের বেশি থাকতে পারলো না। গ্রামে এত খোলামেলা, ঢাকায় তো খোলামেলা নাই। একদিন বাইরে আব্বা আলাদা ভাবে বলল, ‘এখানে খাওয়া-দাওয়ার কোন সমস্যা নাই। কিন্তু ভালো লাগে না, এক রুমে থাকতে।’ আমি বললাম, ‘বাসা ঠিক করে নিচ্ছি, তুমি আমার কাছে আস।’ বাবার একটাই কথা, ‘শেষ জীবনটা গ্রামেই কাটাইতে চায়, গ্রামেই কবর হোক।’ কোন কিছু চিন্তা না করেই কথা দিয়ে দিলাম।
আপাকে বললাম, আপাও বলল তাঁর কাছেও একই কথা বলছে। আপাকে বললাম, ‘তুমি তাহলে আব্বার সাথে থাক, সঙ্গে তোমার ছেলেকেও রাখ।’ আপা বাড়িতে গিয়ে কিছুদিনের মধ্যে কয়েকটা টিওশনি ঠিক করে ফেললো। আমি এদিকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়া নিলাম, একটাও ফ্রি কাজ করবো না। এতে কয়েকজন মন খারাপ করছে। কিন্তু আমরা খুব সাচ্ছন্দে চলতেছিলাম।
মাসখানেক আগে Masud Ananda ভাই হুট করে ফোন দিলেন, খোঁজ খবর দেয়া নেয়ার জন্য। কথায় কথায় বললেন তোমার অবস্থা আমার অবস্থা একই। ফোন আসলেই আতকে উঠি। এলিফেন্ট রোডের অফিস ছেড়ে বাসার কাছে অফিস নিলাম। মোটরসাইকেল নিছি যাতে দ্রুত বাসায় ফিরতে পারি, আম্মাও আমাকে ছাড়া কিছু বুঝে না।
আমার ক্ষেত্রেও তাই হইছে, অনেকবার অনেক অসুস্থ হয়ে গেছে, আমি বাড়ি গেছি একদিনেই ঠিক হয়ে গেছে। শেষের দিকে আমার কথা ছাড়া আর কারো কথা শুনতো না, সুরাইয়ার কথা টুকটাক শুনতো।
সেই ফোনটা আসলো ২৫ তারিখ মধ্য রাতে, আমার তখন ৯৯/১০০ জ্বর। টেরও পাই নাই সকালে উঠে এতগুলা ফোন দেখে মোটামুটি নিশ্চিত হলাম, খারাপ কিছু ঘটে গেছে। আমি ফোন করে বলে দিলাম আসতেছি, তোমরা সব রেডি করে ফেলো। উবার ডেকে কাচপুর থেকে সুরাইয়াকে তুলে নিয়ে সরাসির বাড়ি। সব কাজ শেষে, তিন দিনের মিলাদ শেষে ঢাকায় ফিরলাম, ঢাকায় ফিরেই জ্বরে পড়লাম, ১০৪ উঠে গেছিল, এখন ৯৯/৯৮ উঠানামা করতেছে। ডাক্তার বলছে আর একদিন, জ্বর চলে যাবে কিন্তু দুর্বলতা থাকবে বিশ্রাম নিতে হবে।
এই যে বাবা, আমাকে পেলে সুস্থ হয়ে যেত। এই রকম ছোট বেলায় আমার জ্বর হলে আপা তিন দিনের মধ্যে সুস্থ করে ফেলতো। পরে সুরাইয়া নানা রকম কাজকর্ম করে সুস্থ করে ফেলতো। সুরাইয়া না থাকলে ১/২ দিন বেশি লাগে।
আমাদের সবার উচিত, পরিবারের সদস্যদের সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া।
আমার বাবার জন্য সবাই দোয়া করবেন।
২৫ জুলাই ২০২২

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.