আজকের আমেরিকা (২৭)–শ্রীরামনাথ বিশ্বাস

পুরাতনের সামনেই যদি নতুন কিছু থাকে তবে পুরাতনের জন্য আপশুষ করতে হয় না। আমার সামনে সবই নতুন। পাশের দৃশ্যটিও নতুন। হাজার হাজার মোটরকার পার্ক করা রয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বৃহৎ কতকগুলি কচ্ছপ রৌদ্রে আরাম করে বসে আছে। শুধু কি তাই? অগণিত নরনারী বিশ্বমেলা দেখার জন্য আগিয়ে চলেছে। তাদের দুদিকের ঘরগুলি তত সুন্দর নয় দরিদ্র লোক সেই ঘরগুলিতে থাকে। তারা সকলেই কাজে চলে গেছে নতুবা এত নির্জনতা অনুভব হবে কেন? লোকাকীর্ণ পথের দুদিকের দৃশ্য মোটেই সুন্দর নয়। এ স্থান পর্বে আমি এসে দেখে গিয়েছিলাম, সেজন্যই এই দরিদ্র বাসিন্দার প্রতি একটা সহানুভূতি আপনি মনে জেগে উঠছিল। এখানে হট্ কেইস্ পাওয়া যায় না, প্যরেজ এবং অন্যান্য সুখাদ্য এখানকার রেস্তোরায় পাওয়া যায় না, তার কারণ সকলে জানেনা। যারা জানে তারা সেকথা মুখ খুলে বলে না। বলবার উপায় নাই। আমেরিকার ভাড়াটে সাহিত্যিক মজুর শুধু ধনীদের মন যুগিয়েই প্রবন্ধ লেখে। যখনই এই সাহিত্যিক মজুরগণ বেঁকে বশে এবং তাঁদের মনমত লেখতে আরম্ভ করেন তখন দেখতে পান তাঁদের প্রবন্ধ আমেরিকার কোনও সংবাদপত্রে স্থান পায় না। আমেরিকানরা আমাদের মত অল্পে তুষ্ট হবার লোক নয়। তারা টাকা প্রচুর চায় কারণ খরচ এনতাহার করতে বাধ্য হয়। আর যারা নিজকে সংযত করে চলে তারাই বিদ্রোহী অথবা কমিউনিষ্ট বলে পরিচিত হয়। আমেরিকায় বিদ্রোহী অথবা কমিউনিষ্ট রূপে পরিচিত হওয়া আরামে নয়। কাজ করার অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়, সমাজের লোক মেলামেশা করতে চায় না, এর চেয়ে বিড়ম্বনা আর কি হতে পারে। সাম্যবাদের প্রথম শ্লোকেই বলা হয়েছে সকল রকমের মজুরকে তাদের গুণানুযায়ী কাজ দিতে হবে, আমেরিকার সরকার সেরূপ কোন আইন এখনও করতে পারেনি, তবে ১৯৩৯ সালের শেষ পর্যন্ত দেখেছি যারাই কমিউনিষ্ট বলে পরিচয় দিয়েছে তাদের কাছ হতেই কাজ করার অধিকারের পরিচয় পত্র কেড়ে নিয়েছে। আমেরিকা সরকার কাউকে কাজ দেবেন বলে গ্যারাণ্টি দেন না বটে তবে যারাই উপযুক্ত বয়সে পদার্পণ করে তারাই কর্মক্ষম বলে একখানা সার্টিফিকেট নিতে বাধ্য হয়।

বিশ্বমেলা

ওয়ার্ল্ড ফেয়ারের পাশেই কতকগুলি কেবিন ছিল। কেবিন মানে ছোট এক একখানা কাঠের ঘর। তার ভেতরে রান্না করার গ্যাস, স্নানের জন্য গরম ও ঠাণ্ডা জলের কল এবং একটি বৃহৎ টাব। রান্না করার জন্য বাসন বিনা ভাড়ায় দেওয়া হয়। শুধু খাদ্যদ্রব্য কাছের কোনও গ্রোসারের দোকান হতে কিনতে হয়। কেবিনের ভাড়া প্রতি চব্বিশ ঘণ্টার জন্য মাত্র এক ডলার। আমাদের দেশের হিসাবে তিন টাকা কুরি আনা। অনেকগুলি কেবিন দেখলাম। প্রত্যেকটি কেবিনই্ খালি, কিন্তু আমার জন্য একটি কেবিনও খালি ছিল না। আমি কালা আদমী। কালো লোকের থাকবার জন্য বিশেষ কেবিন রয়েছে–সে কথাটি আমার জানা না থাকায় আমায় অনেকক্ষণ চারিদিকে টহল দিতে হয়েছিল। আমার মুখ দেখেই কেবিনের ম্যানেজারগণ আমাকে এস্থান হতে অন্যস্থানে পাঠাতে লাগল। স্পষ্টভাবে কেউ বলল না অথবা কেউ বলতে সাহস করল না, এই কেবিনগুলি শুধু সাদা লোকের জন্য। শেষটায় যখন নিগ্রোদের কেবিনের কাছে আসলাম তখন একজন ম্যানেজার হেসে বললেন, ‘Now you have come to the right place, have a cabin।’ এতক্ষণে উপযুক্ত স্থানে এসেছেন, এখন একটা কেবিন পেতে পারেন। আমি কেবিনের ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে যখন রেজিষ্টারে আমার নাম বিশুদ্ধ বংগ ভাষায় লিখতে লাগলাম, তখন ম্যানেজারের চমক ভাঙ্গল। ম্যানেজার বলল, ‘আপনি ইংলিশ লিখতে জানেন না?’ আমি বললাম, ‘আমি শুধু নিজের ভাষায় লিখতে এবং পড়তে জানি–ইংরেজি শুধু বলতে পারি।’ ম্যানেজার তখন আমার দেশ কোথায়, আমার কি জাত এবং আমার দেশের নানা সংবাদ নেবার পর কেবিনটা পরিষ্কার করবার জন্য একজন লোক পাঠাল। নিগ্রোরা প্রায়ই কেবিন নোংরা করে রেখে যায় বলেই পরিষ্কারের ব্যবস্থা হয়েছিল। ম্যানেজারগণও নিগ্রোদের কেবিন পরিষ্কার রাখার জন্য কোনরূপ চেষ্টা করে না, কারণ এরা বুঝে না কেবিনে অপরিষ্কার রেখে গেলে পরবর্তী আগন্তুক কষ্ট পায়। কেবিনে সাইকেলটা রেখে, অফিসে গিয়ে ফের নিউইয়র্ক-এ টেলিফোন করে আমার অবস্থানের কথা জানালাম তারপর পুনরায় কেবিনে এসে রান্নার বন্দোবস্ত করলাম। ম্যানেজার মহাশয় দু চারজন আশেপাশে লোককে আমারই কেবিনে ডেকে গল্প জুড়ে দিলেন। কথা হচ্ছিল আমাদেরই দেশ নিয়ে। আমি তাদের কথায় মাঝে মাঝে সায় দিচ্ছিলাম, কিন্তু আমার মন ছিল ওয়ার্ল্ড ফেয়ার-এর দিকে। খাওয়া সমাপ্ত করে বিশ্বমেলা দেখতে বের হলাম।

সুন্দর রাত। অনেক দর্শক জুটেছে। দর্শকদের মাঝে যারা ‘হিচহাইক’ করে এসেছে, তাদের লোটাকম্বল ঘাড়ে বাঁধা দেখলেই চিনতে পারা যায়। তাদের দু-একজনের সঙ্গে কথাও হল। অনেক ‘হিচ-হাইক’ করে কালিফরনিয়া হতে এসেছে। আমার ইচ্ছা হল আমিও ‘হিচ-হাইক’ করে পর্যটন করি। এতে দেখবার সুযোগ আরও হবে। অনেক চিন্তা করে ‘হিচ-হাইক’ করা ঠিক করে বিশ্বমেলা দেখতে গেলাম। নিউইয়র্ক এর বিশ্বমেলা দেখতে আমাদের দেশের দুজন মহারাজা গিয়েছিলেন। তাঁদের বিশ্বমেলা দেখার জন্য সুন্দর বন্দোবস্ত হয়েছিল। তাঁরা যখন মেলা দেখতেন তখন তাঁদের পেছনে বহু লোক চলত। তাঁরা নূতন ধরনের রিকশায় বসতেন। তাঁরা ইচ্ছামত জিনিসপত্রও কিনতেন। তাঁদের বদান্যতা এবং মুক্তহস্ততার জন্য লোকে ভারতবাসী মাত্রকে ধনী বলেই কয়েক দিনের জন্য মেনে নিয়েছিল। কিন্তু আমাদের মত দরিদ্রের আগমনে ভারতের ভয়ানক বদনাম শুরু হল। আমেরিকান পর্যটকদের দেখে পৃথিবীর লোক যেমন ভাবে আমেরিকায় লোক সবাই ধনী, আমাদের দেশের রাজা মহারাজাদের দেখেও পৃথিবীর লোক ভাবে আমরাও সকলেই ধনী। আমেরিকার গভর্ণমেন্ট তাদের দেশে যাতায়াতের যে সব আইন-কানুন করে রেখেছেন, তাতে সেখানে শুধু ধনীদেরই যাওয়া চলে। যারা গরীব তারা সেই অধিকারে বঞ্চিত।

বিশ্বমেলায় পৃথিবীর প্রায় সকল স্বাধীন দেশ থেকেই প্রদর্শনী খোলা হয়েছিল। আমেরিকার প্রত্যেক ষ্টেটও তাদের প্রদর্শনী খুলেছিল। এ সব ছাড়াও আমোদ-প্রমোদের জন্য নানা আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সম্পর্কে আমাদের দেশের লোকদের কয়েকটি কথা বলতে চাই। আমাদের দেশের আমোদ-প্রমোদ এবং আমেরিকার আমোদ-প্রমোদে অনেক প্রভেদ আছে। আমেরিকার প্রত্যেক খেলাতে কিছু অর্থ ব্যয় করতে হয়। তারা অর্থ উপার্জন করতে পারে বলেই খরচ করতেও সক্ষম হয়। বিশ্বমেলাতেও অনুরূপ ব্যবস্থা ছিল। ডুবুরিরা কি করে সমুদ্রের নীচে গিয়ে সেখানে কি আছে দেখে–এমন কি, অনেক সময় সমুদ্রের নীচভাগ সারভে পর্যন্ত করে আসে, আমার তাই দেখতে ইচ্ছা হয়েছিল।

একটি কাচের ঘর ক্রেইনের সঙ্গে আঁটা রয়েছে। যখনই চারজন লোক এক শত কুড়ি ফিট জলের নীচে যেতে প্রস্তুত হয়, তখনই তাদের ঐ কাচের ঘরে প্রবেশ করিয়ে এক শত কুড়ি ফিট ‘সমুদ্রের নীচে নামিয়ে দেওয়া হয়’। এতে সকলেরই বেশ আনন্দ হয়, যদিও এতে মরণের বেশ সম্ভাবনা থাকে। জীবন-মরণ নিয়ে খেলা করতে যে আনন্দ, তা সকলে পছন্দ করে না, কিন্তু আমার তা খুব ভাল লাগে। পঁচিশ সেণ্ট দিয়ে এক শত কুড়ি ফিট নীচে নেমেছিলাম। যতক্ষণ জলের নীচে ছিলাম ততক্ষণ কান দুটা বধির হয়ে ছিল। যখন জলের উপর ভেসে উঠলাম এবং কাচের দরজা খুলে দেওয়া হল, তখন মনে হল নূতন জগতে এসে হাজির হয়েছি। আমাদের দেশে, বিশেষত ইউরোপে এমন অনেক বই আছেÑযাতে সাগর সম্বন্ধে অনেক আজগুবি কথা লেখা রয়েছে। কিন্তু পাঠকগণ জেনে সুখী হবেন, সোভিয়েট রুশিয়ার ডুবুরিয়া কাস্পিয়ান সাগরের তলদেশ জরিপ করতে সক্ষম হয়েছে এবং তাতে অনেক পুরাতন যুগের বাড়িঘরের সন্ধান পেয়েছে। সাগর গর্ভে প্রাপ্ত জিনিসগুলি যত্নের সহিত উঠিয়ে, সর্বসাধারণের দেখবার উপযুক্ত করে কোনও মিউজিয়মে রেখেছে। ডুবুরিয়ার কাজ বড়ই বিপজ্জনক। সোভিয়েট রুশের লোক বিপজ্জনক কাজ করতে একটুও ভয় পায় না।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.