এভারেস্ট: সম্পাদনা প্রসঙ্গে

অদ্রির জন্মের শুরুর দিকে অথবা জন্মের আগে টিওবি থেকে আমরা ‘ভ্রমণ কথামালা’ নামে একটা বই বের করেছিলাম। তখন থেকেই মূলত সালেহীন ভাইয়ের সঙ্গে প্রকাশনা বা পত্র-পত্রিকা নিয়ে কথাবার্তা শুরু বলা যায়। টিওবির প্রথম বই বের করার সময়ই সালেহীন ভাই বলেছিলেন বাংলায় পাহাড়-পর্বত নিয়ে একটা পত্রিকা বের করার কথা। আর অনুজ ভাইয়ের সঙ্গে সখ্যতার শুরুটা বলা যায় ‘চাকা’ পত্রিকা নিয়ে। টিওবির দ্বিতীয় বই যখন বের হয় তখন অনুজ ভাইও আমাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। পাশাপাশি আমার ‘ভ্রমণ কথামালা’ এইসব কাজ করতে গিয়ে আমাদের তিনজনের কেমিস্ট্রিটা ভালমতো মিলে যায়।

অদ্রির শুরুটা হওয়ার কথা ছিল একটা পত্রিকা দিয়ে। কিন্তু লেখা পাওয়ার মতো একটা কঠিন বিষয়ের কারণে আমরা অনেকদিন চেষ্টা করেও বিফল হয়েছিলাম। তারপর ঠিক হইল অনলাইনে শুরু করা যেতে পারে। আমাদের প্ল্যান ছিল অনলাইনের মাধ্যমে কিছু পাঠক আমরা তৈরি করবো। পাঠক তৈরি করা বলতে ম্যাচিউড পাঠক। শুধু পাহাড়ে গেলাম দেখলাম, খাইলাম, ঘুমাইলাম এইসব বিষয় না।

গবেষণা টাইপের লেখা থাকবে। ইতিহাস থাকবে। ব্যর্থতার গল্প থাকবে। পাহাড়ের পাখি নিয়ে লেখা থাকতে পারে, গাছ নিয়ে থাকবে। সোজা কথা অনেক গভিরের বিষয়ও থাকবে। যেসব লেখা পড়ে পাঠকের মনে নতুন নতুন ভাবনা তৈরি হবে, নতুন নতুন চিন্তা তৈরি হবে। এভাবেই অদ্রি অনলাইনের শুরু।

কিন্তু আমরা তিনজন অথবা অদ্রি সম্পাদনা পরিষদের সবাই চাচ্ছিলাম আমাদের প্রিন্টেড কিছু থাকবে। আমার অন্তত প্রকাশনার প্রতিই আগ্রহ বেশি ছিল প্রথম থেকেই এবং এখনও পর্যন্ত আছে। সেই জায়গা থেকে বলা যায় অদ্রির যে মূল লক্ষ্য সে জায়গা থেকে সরে যায় নাই। আমরা একটা বই অন্তত সবার সামনে নিয়ে আসতে পেরেছি।

‘এভারেস্ট’ বই নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল বলা যায় আড়াই বছর আগে। আমরা মোটামুটি বেশ কিছু লেখা পেয়েছিলাম। এর মধ্যে সবার আগে এসেছে বলা যায় ওপার বাংলার লেখা আর এপার বাংলার কিছু লেখাও আমরা যোগাড় করে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমাদের সিনিয়র লেখকদের লেখা পেতে আমরা ব্যর্থ হয়ে ছিলাম বলা যায়। একটা সময় হালও ছেড়ে দেয়ার মতো হয়েছিল। একবার রাগ করে সালেহীন ভাইকে বলেছিলাম, ‘ভাই বাদ দেন। উনাদের ছাড়াই যা আছে তা দিয়েই ছাপিয়ে ফেলি। সম্পাদকীয়তে লিখে দিব আমাদের দেশের সিনিয়রদের লেখা পেতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’

এভাবেই অনেকদিন কাজ থেমে থাকার পরে আবার নতুন করে আমরা শুরু করলাম। এভারেস্ট নিয়ে বইয়ে যদি আমাদের এখানকার এভারেস্ট ক্লাইম্বারদের লেখা না থাকে তাহলে বিষয়টা খুবই খারাপ দেখা যায়। ঠিক হইল উনাদের সঙ্গে সালেহীন ভাই গিয়ে গল্প করবেন। বিভিন্ন প্রশ্ন করবেন। সেইসব উত্তর রেকর্ড করে এনে শুনে শুনে একটা লেখা তৈরি করে ফেলবেন। কি কি প্রশ্ন করবেন সেগুলা অনুজ ভাই কিছু লিখে দিয়েছিলেন আগে থেকে। বিশেষ করে আমরা কি কি চাই। সেসব কথা উনাদের মুখ থেকে বের করে নিয়ে আসা। এই কাজে সালেহীন ভাই পুরাপুরি সফল।

লেখা যোগার থেকে শুরু করে সম্পাদনা পরিষদের অন্যদেরকে লেখা দেখানোসহ সম্পাদনার বেশির ভাগ কাজই সালেহীন ভাই করেছেন। এর পরে যেই মানুষটা সবচাইতে বেশি খাটাখাটনি করেছেন বিশেষ করে টেকনিক্যাল বিষয়, সবকিছু গুছিয়ে রাখার মতো কঠিন কাজগুলা করেছেন অনুজ ভাই। যাঁকে বইয়ে দেবাশীষ চন্দ নামে সবাই চিনবেন। ডিজাইন বা অঙ্গসজ্জার সকল কৃতিত্বও তাঁর একার। আর বইয়ে স্কেচ আর ম্যাপটা এঁকে দিয়ে বইটার মান সম্ভবত আরেকটু উন্নত করার পেছনে আনিকার অবদান আছেই।

এবার আসা যাক সম্পাদনা প্রসঙ্গে। সম্পাদনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে আমাদের তিনজনের মধ্যে সালেহীন ভাই ছাড়া আমরা কেউ ঐভাবে পাহাড় সম্বন্ধে তেমন কিছু জানি না। ব্যক্তিগতভাবে পাহাড় সম্বন্ধে যে রকম পড়াশুনা থাকার দরকার তার কিছুই আমার নাই। আমরা আবার শুধু সালেহীন ভাইয়ের উপর ছেড়ে দিতেও রাজী ছিলাম না। আমরা চেয়েছি আরো দুয়েকজন মানুষ এই বইটার সঙ্গে যুক্ত হৌক। এবং এইসব কাজের জন্য অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ আকাশ ভাই, প্লাবন ভাই, সজীব ভাই, প্রণব ভাইদের কাছে।

বইয়ে সম্পাদকদের নাম দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা চেয়েছিলাম টিওবির মতো সম্পাদনা পরিষদে সবার নাম দিয়ে দায় শেষ করতে। কিন্তু আইএসবিএন নাম্বার আনতে গিয়ে দেখা গেল এখন আর আগের মতো বিষয়টা সহজ নাই। আগে তেমন কিছুই দেখতো না। এখন আইএসবিএন নাম্বার নিতে গেলে যদি একজন লেখক হয় তো লেখরে নাম ঠিকানাসহ সব দিতে হয়। আর যদি সম্পাদিত বই এবং অনেক লেখক থাকেন তাহলে অবশ্যই একজন সম্পাদক হতেই হবে। শুধু সম্পাদনা পরিষদ দিয়ে দায় সারা যাবে না।

তারপর আমরা আরেক ঝামেলায় পড়লাম। সবাই চায় সবার নাম থাকুক। অন্তত সম্পাদনার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য, একার ক্রেডিট কেউ নিবে না। শেষ পর্যন্ত অবশ্যই এটা একটা টিম ওয়ার্ক। সাত ভাই এক বোন চম্পার মতো এটা আটজনের একটা টিমের কাজ।

অনেক দেনদরবারের পরে শেষ পর্যন্ত ঠিক করা হইল সম্পাদক হিসাবে আমার নামই যাবে। আর প্রকাশক হিসাবে সালেহীন ভাইয়ের নাম যাবে। এভাবেই বলা যায় আমার নামটা সামনে আসছে। কিন্তু কাজের কাজ আমি কিছুই করি নাই। আমি মনে করি এইরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সম্পাদক হওয়ার কোন যোগ্যতাই আমার নাই। এই বইয়ের সর্বোচ্চ ক্রেডিট অনুজ ভাই আর সালেহীন ভাইয়ের এখানে বিনয়ের কিছু নাই। উনারা দুইজন যে পরিশ্রম করেছেন তার কাছে আমি কিছুই করি নাই।

আমাদের লেখার মানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে অন্তত নিজেদের কাছে যতক্ষণ পর্যন্ত না ভাল মনে হচ্ছে ততক্ষণ আমরা লেখা নিতে চাই নাই বা বইয়ে দিতে চাই নাই। সকল কাজ শেষ হওয়ার পরে আমরা যখন প্রেসে যাব। তখন সালেহীন ভাই এসে একটা লেখা নিয়ে আপত্তি তুলে বসলো। এই লেখাটা আরো রি-রাইট করতে হবে। আমি অনুজ ভাই তখন চরম বিরক্ত। এমন করলে দেখা যাবে আড়াই বছর না তিন বছর পরেও বই বের হয় কিনা সন্দেহ। কিন্তু শেষ সময়ে সালেহীন ভাই যেই আচরণ করেছেন সেই আচরণ আমরা প্রথম প্রথম করেছিলাম। আমি সরাসরি বলেই দিলাম, ‘আপনে আর কোন লেখাই দেখবেন না। বই বের হবে, তারপর ভুল বের করবেন। আমরা দ্বিতীয় মুদ্রণে ঠিক করবো।’ অনুজ ভাই দেখলাম একই রকম কথা বললেন, ‘এই লেখা এতগুলা মানুষ দেখছে, আমি এত খাটাখাটনি করলাম এইটা আমি দিবই।’ তবে সালেহীন ভাইয়ের কথামতো কিছুটা ঠিকঠাক করেছেন শেষ পর্যন্ত।

এখন পাঠকদের কাছে অনুরোধ থাকবে বইয়ে তথ্যগত ভুল, বানান ভুল যাই দেখেন অদ্রির পেইজের ম্যাসেজে, আমার অথবা আমাদের ইনবক্সে জানাবেন যাতে আমরা পরবর্তী সংস্করণে ঠিক করতে পারি।

বইটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ অনেক জায়গাতেই পাওয়া যাচ্ছে। নিচের লিংকে ক্লিক করলেই সকল প্রপ্তিস্থানের বিস্তারিত পেয়ে যাবেন:

https://www.facebook.com/…/a.39691679050…/1086928328173649/…

২৩ আষাঢ় ১৪২৬

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.