৬৪ জেলায় যা দেখেছি–৩০

৩০ মার্চ (মেহেরপুর থেকে চুয়াডাঙ্গা হয়ে ঝিনাইদহ)

আজকের উদ্দেশ্য চুয়াডাঙ্গা হয়ে ঝিনাইদহ পৌঁছানো। আমঝুপি, গোকুলখালী পার হয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের কাছাকাছি পৌঁছানোর একটু আগে থেকেই মনে হচ্ছেছিল কেউ একজন সাইকেল নিয়ে আমার পেছন পেছন আসছে। আমি যেখানেই থামি তিনিও একটু দূর থেকে থামেন। আমাকে লক্ষ্য করেন। প্রথমে পাত্তা দেয় নাই, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারলাম সত্যি সত্যি সে আমাকে অনুসরণ করছে।
আমি কিছুটা ভয়ে ভয়ে রওনা দিলাম কিছুক্ষণের মধ্যে সেও রওনা দিল। এবার একটু দ্রতই আমার কাছে আসলো, এসেই বললেন।
‘ভাই আপনার সঙ্গে একটু কথা বলার ইচ্ছা যদি একটু সময় দিতেন।’
‘জ্বি বলুন।
‘আমার নাম নাম বিপুল, চুয়াডাঙ্গাতেই থাকি। ভাই আমি আপনাকে দশ কিলোমিটার আগে থেকেই অনুসরণ করছি কিন্তু কথা বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। আপনে তো মনে হয় সাইকেল ভ্রমণে বের হয়েছেন।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু কেন বলুন তো?’
আনন্দিত মুখ নিয়ে বললেন, ‘আমার দশ কিলোমিটার আপনার পেছন পেছন আসাটা বিফল হয় নাই। ভাই আপনে আমার সঙ্গে চলেন স্টুডিও থেকে একটা ছবি তুলবো আপনার।’
আমাদের কথাবলার মাঝখানেই মোটামুটি দশপনের জনের একটা জটলা তৈরি হয়ে গেল। তিনি আমাকে পথ দেখিয়ে শহরের দিকে নিয়ে গেলেন।
সত্যি সত্যি একটি স্টুডিওর সামনে আমাকে দাঁড় করালেন। তারপর স্টুডিওর লোক দিয়ে ছবি তুললেন। বললেন, এই ছবি আমি রাখবো আর এখনকার স্থানীয় পত্রিকায় একটা নিউজ করবো তাই আপনার ছবি তুললাম। আমার কাছ থেকে কিছু তথ্য নিয়ে আমাকে সঙ্গে নিয়ে একটি পত্রিকার অফিসে গেলেন সেখানে আমার ভ্রমণ সম্বন্ধে বিস্তারিত বললেন স্থানীয় এক সাংবাদিকের কাছে। স্থানীয় সাংবাদিক আমার সব কথা একটি কাগজে লিখে নিলেন। পরেরদিন পত্রিকায় খবরটি ছাপাবেন। পত্রিকার নামটাও অদ্ভুত, ‘মাথাভাঙ্গা।’
পত্রিকা অফিস থেকে বের হয়ে বিপুল ভাই আসল কথা শুরু করলেন। ভাই আপনাকে পাওয়াতে আমার যে কি সুবিধা হয়েছে আমি বলে বুঝাতে পারবো না। আপনে আমাকে আরেকটু সময় দেন। আমারও খুব ইচ্ছা বাংলাদেশ ভ্রমণ করবো সাইকেল নিয়ে। কিন্তু আমার বন্ধুরা বিশ্বাস করতে চায় না, বলে এইসব সম্ভব না। যতসব পাগলের কথাবার্তা। পত্রিকায় নিউজ হলে সবাই জানবে এটা সম্ভব এবং স্থানীয় ছেলেমেয়েরাও ভ্রমণে আগ্রহী হবে এটাই আসলে মূল উদ্দেশ্য বিপুল ভাইয়ের।
তিনি আমাকে অনেকটা জোর করেই একটি খাবারের দোকানের সামনে নিয়ে গেলেন। এর মধ্যে উনার বন্ধুবান্দবদের ফোন দেয়া শুরু করলেন। চারপাঁচজনকে ম্যানেজও করে ফেললেন এই অল্প সময়ে। সবাই হাজির আমাকে দেখার জন্য। পাশাপাশি বিপুল ভাইও একটি ডায়েরি নিয়ে প্রস্তুত, আমার রুট প্ল্যান জানার জন্য যাতে তিনি যখন বের হবেন তখন যেন কাজে লাগে। আমি খেতে খেতে রুট ম্যাপ কিভাবে তৈরি করতে হয় তাঁকে শিখিয়ে দিলাম।

পথে নেমে পথের মানুষের সঙ্গে নিজের স্বপ্ন মিলে যাওয়াটা প্রতিনিয়ত উপভোগ করছিলাম। বিপুল ভাইদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার পথে নামলাম। সরোজগঞ্জ পার হওয়ার সময় দুই দিকের দৃশ্য একদম পালটে গেল চারিদিকে লালে লাল। দুই দিকেই লাল শাকের চাষ হচ্ছে, যেদিকেই তাকাই শুধু লাল শাকের ক্ষেত। বদরগঞ্জ পার হওয়ার পর পেলাম ডাকবাংলা বাজার, অদ্ভুত অদ্ভুত সব। বৈডাঙ্গা, হালিধানি বাজার পার হয়ে এক সময় ঝিনাইদহ শহরে পৌঁছালাম।
শহরে পৌঁছে ফোন দিলাম আবদুল্লাহ ভাইকে যাঁর এখানে থাকার কথা। আবদুুল্লাহ ভাই বলে দিলেন কিভাবে উনার ওখানে যেতে হবে। উনার কথা মতো লোকজনদের জিজ্ঞেস করে পৌঁছালাম। উনি আর উনার বন্ধু দুইজনে এক সঙ্গেই থাকেন। পুরা একটা বাড়ি, এর মধ্যে একটা রুমে উনারা থাকেন অন্য রুমগুলাতে যুব উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আব্দুল্লাহ ভাইয়ের বন্ধু মিজান ভাই। দুইজনেই এখানে শিক্ষকতা করেন।
এই দুই জনের পরিচয়টা আলাদা ভাবে দেয়া উচিত। দুই জনেই কোরেশী ভাইয়ের বন্ধু যাঁর নাম বার বার আমার লেখায় এসেছে। কোরেশী ভাই এই দুই বন্ধুর সহযোগিতায় কয়েকটি জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করেছেন। এখানে এসে আমি আবিষ্কার করলাম উনাদের দুইজনের বাসাতেই আমি থেকে এসেছি। অথচ আমি জানি না তাঁদের বাসায় থেকে এসেছি। একজনের বাড়ি কুষ্টিয়া আরেকজনের বাড়ি রাজশাহী। রাজশাহীতে আব্দুল্লাহ ভাইয়ের বাড়িতে ছিলাম আর কুষ্টিয়াতে মিজান ভাইয়ের বাড়িতে। এই বিষয়গুলা অবশ্যই মজার। যে মানুষগুলার বাড়িতে থেকে এসেছি কিন্তু চিনি না এখন সেই মানুষগুলার সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে।

রুমে ঢুকে গোসল করলাম খাওয়া দাওয়া করলাম। তারপর কিছুক্ষণের জন্য ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠে তিনজনে মিলে বের হলাম ঘুরতে। হালকা নাস্তা করার পর মিজান ভাই রুমে ফিরে গেলেন। কিন্তু আমি আর আব্দুলাহ ভাই দুজনে ঘুরতে বের হলাম। আব্দুল্লাহ ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন রোকন ভাই এলজিইডিতে চাকরী করেন। আব্দুল্লাহ ভাইয়ের কাছ থেকে আমরা অনেক গল্প শুনেছেন তাই আমাকে দেখার জন্য বিশেষ অনুরোধ করে রেখেছিলেন।
বাধ্য হয়ে আব্দুল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে রোকন ভাইয়ের বাসায় যেতে হল। রোকন ভাইদের বাসায় হালকা খাওয়া দাওয়া করা হলো। ভাবির সঙ্গে পরিচয় হল, উনাদের একটি ছোট্ট ছেলে আছে ওর সঙ্গেও কিছুক্ষণ খেলাধুলা করলাম। এর মধ্যে ভাবি আর রোকন ভাই জ্বীন-ভূতের গল্প শুরু করলেন। বুঝতে পারলাম রোকন ভাই ভাবি দুইজনেরই জ্বীন-ভূতের প্রতি অগাদ বিশ্বাস। এই বিষয়টা আমাকে অবাক করলো। রোকন ভাই চাকরি করেন এলজিইডিতে তিনি পড়াশোনাও করেছেন বিজ্ঞান বিষয়ে অথচ জ্বীন-ভূত তাবিজ-কবজ বিশ্বাস করেন।
উনাদের বাসা থেকে বের হয়ে আবার রুমে ফিরে আসলাম। খাওয়াদাওয়ার পরে ঘুমাতে যাব এমন সময় বিদ্যুৎ চলে গেল। এই বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা ছিল প্রতি জেলার নিত্য দিনের সঙ্গী। আমরা সবাই মিলে চলে গেলাম ছাদে, বিদ্যুৎ আসা পর্যন্ত ছাদে গল্প করে কাটালাম।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.