টুকরো স্মৃতি -১

কোন বার ঠিক মনে নেই। মনে হয় যেইবার তাজিং ডং যাবার পরিকল্পনা ছিল। খুব সম্ভবত সেইবার Nowshad Talukder, Md Golam Rasul, Maruf Bin Alam আর Kazi Khaled Hossain Rupol ভাই আর কে ছিল মনে নেই।

রুমা নেমে বড় দেখে একটা দা কেনা হল। আমাদের সাধারণ প্র্যকটিস অনুযায়ী আমাদের প্রথম দিনের থাকার জায়গা হল বগামূখ পাড়া।

কোন কারণে রূমা বাজার থেকে রওনা দিতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। বগামুখে যখন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা হতে প্রায় ঘন্টা খানেক বাকি। এখনকার কথা জানি না । তখন পাড়ার দোকান পাট পাড়ার নিচে ঝিরির ধারে ছিল। আমরা চা খেতে বসতে মারুফ ভাই একটা মুরগি ব্যবস্থা করল। আগের একবারের অভিজ্ঞতার কারণে আগেই ঠিক করা ছিল এইবার আমরা রান্না করব।

চা খেয়েই আমরা আমাদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ঝিরিতে গোছল করতে নেমে গেলাম মারুফ ভাই বাদে । উনি একটু হাত পা ধুয়ে গেলেন থাকার জায়গা আর খাবার যোগার করতে।

ঝিরিতে পানি বেশি না। বেশি হলে কোন কোন জায়গায় হাঁটুপানি । কিন্তু খুব স্রোত আর ঠাণ্ডা। এর মধ্যেই শুয়ে-বসে গলা ডুবিয়ে থাকার যে একটা একটা অপার্থিব আর স্বর্গীয় অনুভুতি ছিল বলে বোঝানো যাবে না।

ঝিরিতে বসে পাহাড়ের বুকে সূর্যাস্ত (সূর্য দেখা যেত না, কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে আকাশের রঙ বদলের মধ্যে আরেকটা অবর্ণনীয় অনুভুতি ছিল) দেখে আর মারূফ ভাইয়ের তাড়া খেয়ে যখন উঠছি তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। তখনো চার্জেবল টর্চ বাজারে আসেনি। পুরো টিমের কাছে একটা কি দুইটা টর্চ। তার মধ্যে আমার কাছে মনে হয় দুই পেন্সিল ব্যটারির একটা টর্চ। খুব বেশিক্ষণ জলে না। আর অতিরিক্ত ব্যটারি কেনার সামর্থও ছিল না। তাই অন্ধকারে হাতরে আর মারুফ ভাইয়ের কথা শুনে পাড়ার (আমাদের পাহাড়ে গ্রামগুলো পাড়া নামেই উল্লেখ হয়) এক জায়গায় হাজির হলাম। জায়গাটাকে পাড়া বলা উচিত না মূল পাড়া আরো উপরে। মনে হলো পাড়াটা সম্প্রসারিত হচ্ছে। দুইটা ঘর উঠেছে মাত্র। পাড়ার বেশির ভাগ লোক বাংলায় অভ্যস্ত নয়। কারবারি একটু বাংলা পারে। উনি আমাদের মুরগী যোগার করে উপরে গেছেন। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে তাই পাড়ায় নতুন লোক থাকতে দিতেও একটু দোনমন। কিছুদিন হয় পাড়ার কিছু লোক তুলে নিয়ে গেছে কোন এক সন্ত্রাসী দল। তাই পাড়ার লোকজন নিরাপত্তা নিয়ে একটু চিন্তিত ছিল (না আমরা উনাদের কোন ক্ষতি করব এই ভেবে না, যদি বাইরের লোক এসেছে শুনে আবার হানা দেয়। এখানে একটা তথ্য দিয়ে রাখা ভাল, বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যত জন টুরিস্ট অপহরণ হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়, তার বেশির ভাগ ফিরে এসেছেন বা আসলে অপহরণ হয়েছে তা প্রমাণিত নয়। তারপরও যে সংখ্যা দাঁড়াবে তা বাংলাদেশের একমাসের সড়ক দূর্ঘটনার সংখ্যার তুলনায় নগন্য এবং তার থেকে অনেক বেশি মানুষ অস্ট্রেলিয়াতে বেড়াতে গিয়ে ভাল্লুকের আক্রমণের শিকার হয়)। তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের জায়গা হল পাড়ার নিচের সম্প্রসারিত অংশে। নতুন বাসা। বাড়ির মালিক কারবারি (পাড়া প্রধানের কোন রকম আত্মীয় হত। উনারা অন্য পাড়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন।

এখন আছি আসল গল্পে। আজকে Mainul Islam Rahat এর মূরগী টুকরা করা শেখার কথা পড়ে এই কাহীনি মনে পরল। আমার কাছে কালিজিরা ভর্তা আছে আর ভাতটা দাদাই রান্না করে দিবেন। মুরগীটা রান্না করবেন আমাদের মাল্টি ট্যলেন্টেড মারূফ ভাই ( খাওয়ার পর অবশ্য নওশাদ এটার একটা বিশেষ নাম দিয়েছিল)। তখন বাজারে প্রিমিক্স মসলা আসা শুরু করেছে মাত্র। আমি এইটার ব্যপারে কিছুই জানতাম না । মারুফ ভাই বুদ্ধি করে এবার সব নিয়ে এসেছেন। মুরগীর জবাই আর মাংস কাটার দ্বায়িত্য পরল আমার কাধে। জবাই আর চামরা ছাড়ানোতে কে যেন সাহায্য করল ( আসলে তারাই কাজটা করে দিয়েছিল) কিন্তু টুকরো করার কাজ পরল পুরোটাই আমার ঘাড়ে। মা তখনো কোণ দিন রান্না ঘরে ঢুকতে দেননি আর অনেক কঠিন সময় গেলেও বাবা কোনদিন আমাদের দিয়ে কোন কাজ করান নি ( ছোট খাট বাজার আর বাসা বদলানোর কাজ ছাড়া)।

সুতরাং মুরগী টুকরা করা এলিয়ান পৃথিবীর কাজ টাইপের আমার কাছে। কিন্তু আর কি করার । মারুফ ভাইয়ের কথা মত মুরগী কাটার প্রস্তুতি নিয়ে বসে গেলাম। উনি এইভাবে এইভাবে কি জানি বলে অন্য কাজে চলে গেলেন। আমার একটা দূর্বলতা হল আমি মানুষের ইন্সট্রাকশন জিনিষটা কোন দিনই ঠিক মত বুঝি না। এই ক্ষেত্রে আমি পুরো পুরিই বলদ টাইপের। এখনও তাই।

ঘুট ঘুটে অন্ধকারে রুমা বাজার থেকে কেনা দা টা নিয়ে বসে গেলাম সামনের মাচানে। টর্চ জালাতে আমরা খুব মিতব্যায়ী। ঐখানকার দা যারা দেখেছেন তারা জানেন দাগুলো লম্বাটে।  মূরগীটাকে মাচানে রেখে কোপ মারি কিন্তু প্রায় কিছুই হয় না। আবার কোপ, আবার কোপ, আবার কোপ, আস্তে আস্তে ছোট ছোট টুকরা হওয়া শুরু করল। কিন্তু একটা টুকরো করতেই ২০-৩০ বার কোপ দিতে হয়। তার উপর কোন দিন কোপাকুপি করি নাই, তাই একেকটা কোপ একেক জায়গায় পরে। পাহাড়ি মুরগীর জায়গায় আজকের বয়লার মুরগী হলে মনে হয় ঐদিন মুরগীর ভর্তা খেতে হত। এইভাবেই কুপিয়ে চলছি আর মনে মনে গজগজ করছি। কি ##র দা কিনেছে মারুফ ভাই। এর মধ্যে বিভিন্ন জন এসে তদারকি করে যাচ্ছে (বুঝেন অন্ধকারে তদারকি) আর এতদেরি কেন জিজ্ঞাসাকরে যাচ্ছে। কোপাকুপি প্রায় শেষ। শেষ টুকরোটা কোপাচ্ছি তখন। হঠাৎ কে যেন এলো আলো নিয়ে। হঠাৎ আলোয় চোখে পরল দায়ের উপর। নিজেকে গালি দিব না হাসব বুঝতে পারলাম না। এতখনে পুরো বিষয়টা খোলাশা হল। এই পাহাড়ি হাড়ের মুরগীটা আমি পুরোটাই আমি টুকরো করেছি দায়ের উলটো দিক (ভোতা দিক) দিয়ে কুপিয়ে।

আমি কোন বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী নই বা আমি এটা পারি বলতে পারার মত কিছু নেই। অলস ও ভিতুও। প্রচুর দুর্বলতা। তার পরও বেছে যুদ্ধে যখন কিছু করার সময় আটকিয়ে যাই তখন এই ঘটনটার কথা মনে পরে। কিছু কাণ্ডজ্ঞান আর করতেই হবে মনভাব শেষ পর্যন্ত কোন একটা ভাল সমাধানে বা সমাপ্তি আসবেই। আর হবে কিছু অভিজ্ঞতা, যা পরের বার কোন কাজ সহজে, কম সময়ে বা ভাল ভাবে করতে সাহায্য করে।

কোনদিন যদি আমার নিজের কোন প্রতিষ্ঠান হয় আর তাতে আমি ম্যানেজমেন্ট লেভেলে যে লোকজন নিব তাদের একটা গুনই আমি বিচার করব তা হল কাণ্ডজ্ঞান (Common Sense)। আমার কাছে টেকনিকাল  ও একাডেমিক জ্ঞান একজন ক্লার্ক (নামে ম্যানেজার বা তার থেকে বেশি কিছু হলেও) এর যোগ্যতা বিচারের মাপকাঠি।

পুনশ্চ ১- ছবিটি এই ট্রিপের না। পরবর্তী কোণ এক সময়ের। দিতে ইচ্ছা হল তাই দিলাম। ছবি সূত্র- নওশাদ তালুকদার

পুনশ্চ ২ – শেষ প্যরার ব্যপারে। এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত। আমি এটাও বিশ্বাস করি সকল বিষয়েরই ব্যতিক্রম আছে।

 

লেখক: জামান রাহাত খান

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.