কাকের প্লেট

প্রতিটা পরিবারের অথবা অনেক পরিবারের কিছু কিছু দখল করার মতো বিষয় থাকে। সেটা কিভাবে কিভাবে যেন তৈরি হয়ে যায়। অনুসন্ধান করলে তার উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেমন একটু বড় হওয়ার পরেই দেখা গেছে বাসায় এক খাটে আমরা তিন ভাইবোন ঘুমাতাম। বড় বোন মাঝখানে আমরা ছোট দুই ভাই দুই পাশে। দুই ভাইয়ের মধ্যে কোন ভাই কোন পাশে ঘুমাবো সেটা নির্দিষ্ট করা ছিল। কখনোই এর ব্যত্যয় ঘটতো না।

আবার খাবারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে অনেকদিন পর পর আমাদের হাঁস রান্না করতো। আমাদের বাসায় কোন একটা কারণে খুব একটা মুরগি রান্না হতো না, মাংসের বিষয় আসলেই গরু অথবা হাঁসের বিষয়টা আসতো। আর হাঁস রান্না করা হলে, হাঁসের কোন টুকরাটা আমার পছন্দ অথবা কোন টুকরাটা ছোট ভাইয়ের সেটাও ঠিক করা ছিল। যাঁদের মা পৃথিবীতে বেঁচে নাই আমি নিশ্চিত সবাই একমত হবেন মায়ের রান্নার মতো পৃথিবীর আর কারো রান্না কেউ মিস করে না। আমার ক্ষেত্রেও তাই, বিশেষ করে এই মায়ের হাতের হাঁস রান্না আমি প্রচণ্ড মিস করি। আর সেই লোভ থেকেই কেউ যদি পছন্দের খাবারের কথা বলে অথবা খাওয়াতে চায় তখন সবাইকে হাঁসের কথাই বলি। সুরাইয়া বাড়ি গেলে সব সময় হাঁস রান্না করে নিয়ে আসে, এমন কি আমি ওদের বাড়িতে কখনো যাই নাই কিন্তু ওর বড় বোন সব সময় আমার জন্য হাঁস পাঠায়।

আমাদের আরো কয়েকটা বিষয় ছিল দখলকৃত। আমরা সবাই একসাথে খেতে বসতাম ফ্লোরে। কে কোথায় বসবে সেটাও একদম অঘোষিতভাবে ঠিক করা ছিল। এইসব দখলকৃত বিষয় নিয়া আমাদের দুই ভায়ের মধ্যে মাঝে মাঝে ঝগড়া হতো। আরো একটা হইল প্লেট। আমাদের নির্দিষ্ট প্লেট ছিল। ছোট ভাই একটা কাসার থালায় ভাত খেত। আমার কাসার থালা না থাকলেও অন্যরকম চিহ্ন দেয়া একটা প্লেট ছিল। এই প্লেটের বাইরে গিয়ে অন্য প্লেটে খেতাম না। আমার প্লেটে কেউ খেতে বসলেও এটা নিয়া তুলকালাম ঘটে যেত।

আম্মা মারা যাওয়ার সাথে সাথে এইসব দখলকৃত বিষয়গুলা সবই কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আম্মা বেঁচে থাকতে একটা কথা বলতেন, যদি কোন পরিবারে বাবা আগে মারা যায় তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মা সংসারটাকে আগলে রাখেন সবাইকে নিয়ে। কিন্তু মা মারা গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই সংসার খুব একটা টেকে না। সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হয়তো টিকে কিন্তু সেটা নগন্য। এই বিষয়টা যখন আম্মা বলতো তখন ঐভাবে আমলে নেই নাই। কিন্তু পরবর্তীতে বাস্তবতা আমাকে খুব সুন্দর করে দেখিয়ে দিয়েছে।

আমরা যখন সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। বাবা এক দিকে, বড় ভাই এক দিকে, বড় বোন আরেক দিকে। আমরা দুই ভাই নাখালপাড়ায় এক বছর এক মাস এক সাথে ছিলাম। শেষ তিন মাস প্রচণ্ড সমস্যায় ছিলাম। বাসাটাসা ছেড়ে দিয়ে আমি থাকি শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগারে আর ছোট ভাই ওর এক বন্ধু দোকানে।

পাঠাগারে থাকা অবস্থাতেই ছোট ভাই একটা দোকানে কাজ পেয়ে যায়। আমিও এলিফ্যান্ট রোডের ‘কাকে’ কাজ পাই। শেষ তিনমাস ছিল প্রচণ্ড দুঃসময়ের দুই ভাইয়ের জন্যই। কখনো এক বেলা খাই কখনো দুই বেলা খাই এই অবস্থা। একদিন রাতে চিশতি ভাইয়ের বাসা থেকে খেয়ে এসে পাঠাগারে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি এমন সময় চিশতি ভাই আবার ডেকে পাঠাইলেন বাসায়। গিয়ে পরিচয় হলো শওকত ভাইয়ের সাথে। শওকত ভাই-ই বলা যায় চিশতি ভাইয়ের মাধ্যমে আমাকে এক অর্থে রাস্তা থেকেই তুলে আনলেন। শওকত ভাইকে নিয়ে অনেক স্মৃতি আছে আরেকদিন ভালমতো লিখতে হবে।

এলিফ্যান্ট রোডে কাকে নতুন জায়গায় কাজ শুরু হলো। রাতে অফিসেই থাকি। এখানেই খাওয়া-দাওয়া। রান্না-বান্নাও নিজের করতে হয়। এখানে আসার সময় নাখালপাড়া থেকে বাবু মামার কাছ থেকে তাবলিগের একটা স্লিপিং ব্যাগ নিয়া আসছিলাম। ঐটার ভিতরে জামা-কাপড়ও রাখা যায়। থালা-বাসন সবই অফিসে আছে কিছুই কিনতে হয় নাই। তখন প্রথম ১৫ দিন শুধু একই জিনিশ খেতাম। আলু ভর্তা, ডাল আর ডিম ভাজি। কাকে এসে বিশাল একটা থালায় ভাত খেতাম। বিশাল থালাটা কাসার না, স্টিলের।

ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন অথবা মৃত্যুদিন আসলে বিশেষ নাটক অথবা সিনেমা দেখাইত। ঐখানে হিন্দু ধর্মালম্বীদের যেমন বড় থালায় খাবার পরিবেশন করা হতো সেই রকম থালা ছিল বলা যায়। আমি এই প্লেটে ভাত নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে মাঝখানে গর্ত করে জায়গা তৈরি করতাম। তারপর সেই গর্তে ডাল ঢেলে দিতাম, আলু ভর্তা আর ডিম আশেপাশে রাখতাম। ঐটা বেশ তৃপ্তি সহকারে খেতাম। এতটা তৃপ্তি নিয়ে মনে হয় আর জীবনেও খাওয়া হয় নাই। সম্ভবত তখন থেকেই আমার প্রিয় খাবার আলুর ভর্তা, ডাল আর ডিম ভাজি।

এরপর থেকে কাকের সেই বড় থালাটা আমার জীবনের অংশ হয়ে গেল। যতদিন কাকে ছিলাম ততদিন এই থালা বা প্লেটে ভাত খেয়েছি। এই থালাগুলা আমার কাছে অদ্ভুত এক আবেগের জায়গা। এই থালাগুলা শওকত ভাই কোত্থেকে যেন কিনেছিলেন, হয়তো নিউ মার্কেট হবে। কাকে যত লোকজন আসছে সবার কাছে এই থালাগুলা পরিচিত। দেখা গেছে আমি কাক ছেড়ে দিয়েছি কিন্তু কাকে ঘুমানো ছাড়া হয় নাই। অন্যান্য জায়গায় কাজ করলেও রাতে এসে ঠিকই কাকে ঘুমাতাম, রান্না করে খেতাম। কাক যখন পুরাপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন বিভিন্ন জিনিশপত্র বিক্রি করে দেয়া হলো কিছু কিছু জিনিশ একে ওকে দিয়ে দেয়া হলো।

আমি খুব আগ্রহ নিয়া এই থালাগুলা আমার কাছে রেখে দিলাম, কাউকে দেই নাই। এই থালায় ভাত খেলে এখনো সেই কাকের দিনগুলার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে আলুর ভর্তা, ডাল আর ডিম দিয়া ভাত খাওয়া। বড় ধরনের কোন কিছু না হলে হয়তো আজীবন এই থালাগুলা আমার কাছে রয়ে যাবে।

কোথায় ছিলাম, কোথায় আসছি, সামনেও যে কোথায় যাব কে জানে…

২৬ আষাঢ় ১৪২৭

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.